বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের ঘাটতি। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি ক্রয় আইনের আওতায় আনা নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর শর্ত এতটাই কঠোর যে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ আগ্রহ হারাচ্ছে
সরকারি নীতির পরিবর্তন ও নতুন উদ্যোগ
সংস্কার উদ্যোগের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিশেষ বিধান বাতিল করে সব ধরনের ক্রয় কার্যক্রমকে সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালার আওতায় আনে। এর পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় ১০ থেকে ২৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মোট পঞ্চান্নটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দরপত্র আহ্বান করে। লক্ষ্য ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
দরপত্রে কম অংশগ্রহণের চিত্র

গবেষণায় দেখা গেছে, ঘোষিত পঞ্চান্নটি প্যাকেজের মধ্যে তেইশটিতে মাত্র একটি করে দরপত্র জমা পড়ে এবং তেরোটি প্রকল্পে কোনো দরপত্রই পাওয়া যায়নি। গড়ে প্রতিটি প্রকল্পে দরপত্রের সংখ্যা ছিল মাত্র দেড়টির কাছাকাছি। এই চিত্র থেকেই বোঝা যায় বিনিয়োগকারীদের অনীহার মাত্রা কতটা গভীর।
আর্থিক সক্ষমতার শর্ত বড় বাধা
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অংশ নিতে দরদাতাদের প্রতি মেগাওয়াটে বিপুল পরিমাণ তরল সম্পদ বা ঋণসুবিধা দেখাতে হচ্ছে। এই শর্ত বিদেশি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ স্থানীয় প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, এই আর্থিক যোগ্যতা পূরণ করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
সার্বভৌম গ্যারান্টির অভাব ও ঝুঁকি
আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে সার্বভৌম গ্যারান্টির অনুপস্থিতি। প্রকল্প বাস্তবায়ন চুক্তি না থাকায় বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে সরকারি নিশ্চয়তা মিলছে না। এতে ব্যাংক ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা কমছে এবং বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে মত দিয়েছে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী।

জমি ও কারিগরি শর্তের জটিলতা
জমি অধিগ্রহণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব দরপত্রে জয়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দেওয়াও বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। জমির স্বল্পতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান আগেই পিছিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নির্দিষ্ট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাধ্যবাধকতাকে অবাস্তব বলে মনে করছেন বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী, কারণ সময়ের সঙ্গে সৌর প্যানেলের সক্ষমতা কমে এবং আবহাওয়ার ওপর উৎপাদন নির্ভরশীল।
স্বচ্ছতা ও বৈষম্যের অভিযোগ
দরপত্র প্রকাশের আগের ধাপে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলক স্বচ্ছতা থাকলেও দরপত্র জমা দেওয়ার পর প্রক্রিয়া ধীর এবং অস্বচ্ছ হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে, বিশেষ করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ ছিল বেশি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ প্রশ্নে
গবেষণার সারকথা হলো, ক্রয় কাঠামোতে লক্ষ্যভিত্তিক সংস্কার, ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্তই থেকে যাবে। নীতিগত সদিচ্ছা থাকলেও বাস্তবায়নের জটিলতায় সেই লক্ষ্য পূরণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















