কম্বোডিয়ার রাজধানী ফনম পেনের চারুকলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একটি প্রশিক্ষণকক্ষে ধীরে ধীরে হেঁটে চলেছেন প্রবীণ নৃত্যগুরু পেন ইয়োম। কিশোরী শিক্ষার্থীদের কারও বাঁকানো আঙুল ঠিক করছেন, কারও মাথার কোণ সামান্য ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। শতাব্দীপ্রাচীন এক শিল্পের সূক্ষ্ম ভঙ্গি তিনি তুলে দিচ্ছেন নতুন প্রজন্মের হাতে।
খেমার শাস্ত্রীয় নৃত্য, যা ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের তালে পরিবেশিত হয়, পরিচিত তার মনোমুগ্ধকর হাতের ভঙ্গি ও দৃষ্টিনন্দন পোশাকের জন্য। প্রায় এক হাজার বছরের ইতিহাস বহন করা এই নৃত্য একসময় কম্বোডিয়ার রাজদরবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। তবে সত্তরের দশকে খেমার রুজ শাসনের ভয়াবহ গণহত্যা কোনোমতে টিকে গেলেও আজ আবার নতুন সংকটে পড়েছে এই শিল্প।
মাধ্যম ও বিনোদনের ধরন বদলে যাওয়া, অর্থনৈতিক চাপ আর সীমিত অর্থায়নের কারণে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমছে। ফনম পেনের চারুকলা বিদ্যালয়ে ভর্তির হার কমে গেছে, আর নয় বছরের কঠোর প্রশিক্ষণ শেষ করার আগেই অনেকেই ঝরে পড়ছে।
খেমার রুজ শাসনামলে প্রায় সব ওস্তাদ নৃত্যশিল্পী ও সংগীতজ্ঞকে হত্যা করা হয়েছিল। প্রায় বিশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু বা অনাহার, রোগ ও অতিরিক্ত শ্রমে মৃত্যুর মধ্যে শিল্পীরাও ছিলেন লক্ষ্যবস্তু। তৎকালীন শাসকেরা নৃত্যশিল্পীদের শিক্ষিত ও সামন্তবাদী অতীতের প্রতীক মনে করে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে চেয়েছিল।
পেন ইয়োম সেই সময় নিজের পরিচয় গোপন রেখে বেঁচে যান। উনিশশো ঊনআশিতে শাসন পতনের পর তিনি অল্প কয়েকজন নৃত্যশিল্পীকে নিয়ে আবার এই শিল্পকে দাঁড় করানোর চেষ্টা শুরু করেন। আট বছর বয়সে রাজপ্রাসাদে তার প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল। আজ আটাত্তর বছর বয়সে এসে তিনি শঙ্কিত, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই নৃত্য ধরে রাখবে কি না।
তার ভাষায়, নাতি-নাতনিদের মতো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে দাদির মতো চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এই শিল্প বাঁচাতে।
এই কঠিন পথের কথা মনে করিয়ে দেন তরুণী নৃত্যশিল্পী ইয়াং সোফিয়াকত্রা। তিন বছর আগে স্নাতক হওয়া এই শিল্পী জানান, প্রশিক্ষণ ছিল ভীষণ কঠোর। আঙুল বাঁকাতে গিয়ে একশ পর্যন্ত গুনতে হতো। অসংখ্য ভঙ্গি মনে রাখতে হতো। অনেক সময় ক্লান্তিতে ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করত। তার বাবা নিজেও নৃত্যশিল্পী হলেও মেয়েকে শিল্পের পথে আসতে চাননি। তবু সে এগিয়ে গেছে নতুন ভাবনায় এই নৃত্য সংরক্ষণের আশায়।
রাজকীয় নৃত্য নামেও পরিচিত এই শিল্প একসময় রাজাভিষেক ও রাজপরিবারের বিয়ের মতো অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হতো। উনিশশো ছয়ে এটি প্রথম ইউরোপে পরিচিত হয়। দুই হাজার তিন সালে ইউনেস্কো একে মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সংস্থাটি জানায়, বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ ছাড়া এই নৃত্যের ভঙ্গি আয়ত্ত করা যায় না, যেখানে ভয়, রাগ, প্রেম আর আনন্দের সব অনুভূতি ফুটে ওঠে। তবু আশঙ্কা রয়ে গেছে, এটি কেবল পর্যটন বিনোদনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।
ফনম পেনের চারুকলা বিদ্যালয়ে বর্তমানে নব্বইয়ের বেশি শিক্ষক আছেন। সকালবেলা নৃত্যচর্চা, বিকেলে সাধারণ পড়াশোনা। পড়াশোনা বিনা খরচে হলেও আবাসন সুবিধা কমিয়ে দেওয়ায় আর্থিক চাপে অনেক পরিবার টিকতে পারে না। এ বছর মাত্র ঊনচল্লিশজন আট বছর বয়সী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে, যা স্বাভাবিক সংখ্যার অর্ধেকের একটু বেশি।
প্রশিক্ষক হ্যাং সোফিয়া জানান, নতুন শিক্ষার্থীদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখে ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি তৈরি করার চেষ্টা করেন তিনি। তার আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত বড়জোর পনেরোজন এই পথে টিকে থাকবে। আধুনিক সময়ে সবকিছু যখন মোবাইলের ভেতর, তখন ঐতিহ্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তবু আশার আলোও আছে। শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী টোলা থিনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের নৃত্য তুলে ধরেন। হাজার হাজার অনুসারীর কাছে তিনি এই শিল্পের সৌন্দর্য পৌঁছে দিতে চান। তার বিশ্বাস, এই নৃত্য শুধু সুন্দরই নয়, কম্বোডিয়ার পরিচয়ের অংশ। তাই ভবিষ্যতেও তিনি এটিকে বাঁচিয়ে রাখতে চান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















