নিউইয়র্কের নতুন মেয়র হিসেবে নববর্ষের প্রথম প্রহরে শপথ নিতে যাচ্ছেন জোহরান মামদানি। চৌত্রিশ বছর বয়সী এই রাজনীতিকের উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে যেমন নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি নিজ দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরেও তৈরি করেছে অস্বস্তি ও দ্বিধা। বিপুল ভোটে জয় পেলেও দলের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ এখনো তার রাজনীতিকে পুরোপুরি আপন করে নিতে পারছে না।
নতুন মুখ, নতুন ভাষা

উগান্ডায় জন্ম নেওয়া ভারতীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান মামদানি ২০২৫ সালের নির্বাচনে নিউইয়র্কের মেয়র পদে জয় পান পঞ্চাশ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়, সাবলীল বক্তা হিসেবে তিনি অল্প সময়েই ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, ভাড়া স্থির রাখা, বিনা মূল্যে গণপরিবহন ও সার্বজনীন শিশু যত্নের প্রতিশ্রুতি তাকে নগরবাসীর কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান তার রাজনীতিকে আরও স্পষ্টভাবে বাম ধারায় স্থাপন করে।
ডেমোক্র্যাটিক দলে দ্বিধা ও ভয়
মামদানির এই দ্রুত উত্থান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরের পুরোনো বিভাজনকে সামনে এনেছে। অনেক নেতা তার সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন। শীতল যুদ্ধের সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সমাজতন্ত্র শব্দটি যে ভয় ও সন্দেহের প্রতীক, সেই ঐতিহাসিক বোঝাই দলটির ভেতর এই অস্বস্তির বড় কারণ। রিপাবলিকানদের হাতে ‘সমাজতান্ত্রিক’ তকমা অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে—এই আশঙ্কাও প্রবল।

সমর্থন পেলেও দূরত্ব
নির্বাচনী জয়ে বামপন্থী প্রগতিশীল নেতাদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। তার শপথ অনুষ্ঠানেও থাকছেন পরিচিত বাম ধারার রাজনীতিকেরা। সমাজতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তাকে ওই ধারার প্রতীকী মুখে পরিণত করেছে। তবে দলীয় নেতৃত্বের আচরণ ছিল অনেকটাই সংযত। নির্বাচনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনেক প্রভাবশালী নেতা প্রকাশ্যে সমর্থন দেননি। কেউ কেউ তো সরাসরি তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে টানাপোড়েন
মামদানির রাজনীতির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হয়ে উঠেছে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে তার অবস্থান। ফিলিস্তিনি আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতি এবং কিছু স্লোগান নিয়ে স্পষ্ট নিন্দা না করায় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষ স্তরে উদ্বেগ ছড়ায়। নিউইয়র্কে বড় ইহুদি জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

মেয়র হিসেবে বাস্তবতার মুখোমুখি
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন জেতা আর শহর পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। রাজ্য ও ফেডারেল সরকারের অর্থ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হতে হলে মামদানিকে বাস্তবতার সঙ্গে সমঝোতা করতেই হবে। নীতিগত অবস্থানে কিছুটা সংযম ও মধ্যপন্থায় আসা তার জন্য প্রায় অনিবার্য বলে মনে করছেন দলীয় কৌশলবিদেরা। শেষ পর্যন্ত নাগরিকদের ফোন আসবে রাস্তার গর্ত, বাস পরিষেবা বা দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান নিয়ে—এই বাস্তবতাই তাকে নতুন পথে নিতে পারে।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত
মামদানির জয় অনেক ডেমোক্র্যাট নেতার কাছে নতুন করে ভাবার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পুরোপুরি বাম দিকে না গিয়ে পুরোনো ও নতুন চিন্তার মিশেলে এমন একটি রাজনৈতিক ভাষা খোঁজার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন তারা, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবে। দলের ভেতরের মতপার্থক্যকে তারা ভাঙনের কারণ নয়, বরং বড় জোট গঠনের বাস্তবতা হিসেবেই দেখতে চাইছেন।
শেষ পর্যন্ত মামদানির উত্থান শুধু একজন মেয়রের গল্প নয়। এটি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পরিচয়, কৌশল ও ভবিষ্যৎ পথচলার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















