০৯:৫০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬
ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধকে কীভাবে ভাবা উচিত আলিসা লিউ ও আইলিন গু: দুই দেশের আয়নায় প্রতিচ্ছবি মানুষ ৪০ হাজার বছর আগে লিখতে শিখেছিলো কেন পর্যাপ্ত ঘুমের পরও অনেকেই সারাক্ষণ ক্লান্ত বোধ করেন গুচির দেহমোহে বাজি, নব্বই দশকের ঝলক ফেরাতে ডেমনার সাহসী প্রদর্শনী জাপানের ধনীদের দিকে ঝুঁকছে কেকেআর ও ব্ল্যাকস্টোন, মার্কিন বেসরকারি সম্পদ বাজারে অস্থিরতার মধ্যেই নতুন কৌশল মুন দুবাই কি সত্যিই বাস্তব হচ্ছে? ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানালেন প্রতিষ্ঠাতারা সাউথ চায়না সি আচরণবিধি ২০২৬-এর মধ্যে সম্ভব নয়: বিশেষজ্ঞের সতর্কবার্তা আগের ধস কাটিয়ে শুরুতেই ঘুরে দাঁড়াল ডিএসই ও সিএসই সাতক্ষীরার শ্যামনগরে প্রেস ক্লাব সভাপতির ওপর হামলা, আটক ২

ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধকে কীভাবে ভাবা উচিত

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে ভাবতে হলে আপনাকে একই সঙ্গে একাধিক ধারণা মাথায় রাখতে হবে। এটি জটিল ও রঙিন কাচের নকশার মতো পরিবর্তনশীল একটি অঞ্চল, যেখানে ধর্ম, তেল, গোষ্ঠীগত রাজনীতি এবং পরাশক্তির রাজনীতি প্রতিটি বড় ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। আপনি যদি সাদা-কালো সরল বর্ণনা খুঁজে থাকেন, তবে অন্য কিছু বেছে নেওয়াই ভালো। তাই আজকের জন্য ইরান নিয়ে আমার চারটি ভাবনা তুলে ধরছি।

প্রথমত, তেহরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা উৎখাতের এই প্রচেষ্টা সফল হোক—আমি তা কামনা করি। এই শাসন নিজেদের জনগণকে হত্যা করেছে, প্রতিবেশী দেশগুলোকে অস্থিতিশীল করেছে এবং এক মহান সভ্যতাকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে। তেহরানের ইসলামি শাসনের পরিবর্তে এমন নেতৃত্ব এলে, যারা একান্তভাবে ইরানের জনগণকে নিজেদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশ এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রকৃত কণ্ঠস্বর দেওয়ার দিকে মনোযোগ দেবে, তবে সেটিই হবে এমন একটি একক ঘটনা যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে আরও মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পথে এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখবে।

দ্বিতীয়ত, এটি সহজ হবে না। এই শাসন গভীরভাবে প্রোথিত এবং কেবল আকাশপথে হামলা চালিয়ে একে সরানো সম্ভব নয়। ইসরায়েল দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্মম বিমান ও স্থলযুদ্ধ চালিয়েও গাজায় হামাসকে নির্মূল করতে পারেনি—আর হামাস তো একেবারে পাশের অঞ্চলেই। তা সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই হামলা যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আহ্বান অনুযায়ী ইরানি জনগণের বিদ্রোহ সৃষ্টি না-ও করে, তবুও এর অপ্রত্যাশিত ইতিবাচক ফল হতে পারে—যেমন একটি অনেক কম হুমকিস্বরূপ “ইসলামিক রিপাবলিক ২.০”। তবে একইভাবে অপ্রত্যাশিত বিপদও তৈরি হতে পারে—যেমন ইরান একটি একক ভৌগোলিক রাষ্ট্র হিসেবে ভেঙে পড়া।

তৃতীয়ত, আমাদের মনে রাখতে হবে এই যুদ্ধের সমাপ্তির সময় নির্ধারণ করবে কেবল ইরানের ভেতরের সামরিক পরিস্থিতি নয়; তেলবাজার ও আর্থিক বাজারও সমান ভূমিকা রাখবে। ইরান অর্থনৈতিক ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তাদের মুদ্রার মূল্য প্রায় অর্থহীন। রাশিয়ার গ্যাস ক্রয় বন্ধ করার পর ইউরোপ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি থেকে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি ট্রাম্পের সমর্থকদের ক্ষুব্ধ করতে পারে, যাদের অনেকেই আরেকটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া পছন্দ করেন না। অনেকেই চাইবেন যুদ্ধটি সংক্ষিপ্ত হোক—এটি ট্রাম্প ও তেহরানের আলোচনার ধরন ও সময়কে প্রভাবিত করবে।

চতুর্থত, ইরানে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এই যুদ্ধ যেন আমাদের যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প বা ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কারণে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের ওপর যে হুমকি তৈরি হয়েছে, তা ভুলিয়ে না দেয়। ট্রাম্প তেহরানে এসব আদর্শ প্রচারের কথা বলছেন, অথচ আমার নিজ অঙ্গরাজ্য মিনেসোটায় তার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ দুই মাস ধরে আইনি সীমাবদ্ধতার তোয়াক্কা না করেই অভিযান চালিয়েছে, এবং তিনি পরবর্তী নির্বাচনে কারা ভোট দিতে পারবে তা সীমিত করার ধারণাও ভাসাচ্ছেন। ইরান যুদ্ধ যদি নেতানিয়াহুকে এ বছরের নির্ধারিত নির্বাচনে জিততে সাহায্য করে, তবে তা পশ্চিম তীর সংযুক্তকরণ, ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টকে দুর্বল করা এবং ইসরায়েলকে একপ্রকার বর্ণভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করতে পারে—যা ইরানের বাইরেও অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য বড় ধাক্কা হবে।

US strikes Iran: Trump's war, briefly explained | Vox

মতামত লেখকের জীবন সহজ হতো যদি প্রতিটি যুদ্ধ হতো আমেরিকার গৃহযুদ্ধের মতো এবং প্রতিটি নেতা হতেন আব্রাহাম লিংকনের মতো। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। তাই এই চারটি ভাবনা নিয়ে একটু গভীরে যাই।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্যাম্পাসের বামপন্থী বক্তব্য শুনলে বোঝা যেত না, কিন্তু ১৯৭৯ সাল থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানই এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। তারা সিরিয়া, লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেন—এই চারটি আরব রাষ্ট্রে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে প্রক্সি গোষ্ঠী গড়ে তুলেছে এবং সেখানে উদার সংস্কারপন্থীদের দুর্বল করতে সাম্প্রদায়িক বিভাজন উসকে দিয়েছে।

গত দুই বছরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর আঘাতে তেহরান শাসন দুর্বল হয়েছে, যার ফলে সিরিয়ায় ইরান-সমর্থিত আসাদ সরকারের পতন ঘটেছে এবং লেবানন হিজবুল্লাহর শক্ত গ্রিপ থেকে কিছুটা মুক্ত হয়েছে। এর ফলে সেখানে বহু দশকের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই কারণেই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু অঞ্চলজুড়ে নীরবে বা প্রকাশ্যে উদযাপিত হচ্ছে।

এ ছাড়া ইরানের জনগণ অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে পশ্চিমপন্থী বলে বিবেচিত। যদি সেই প্রবণতা প্রকাশ পায় এবং শাসনের ছড়ানো বিভাজনমূলক উগ্র ইসলামি বিষকে প্রতিস্থাপন করে, তবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

লেবানন-আমিরাতি কৌশলবিদ নাদিম কোটেইচ আমাকে বলেছিলেন, কারণ ছাড়া নয় যে ইরানে শাসনবিরোধী বিক্ষোভকারীদের অন্যতম জনপ্রিয় স্লোগান ছিল: “না গাজা, না লেবানন—আমার জীবন ইরানের জন্য।” বহু ইরানি ক্ষুব্ধ হয়েছেন দেখে যে তাদের সম্পদ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াইরত মিলিশিয়াদের পেছনে নষ্ট হচ্ছে। কোটেইচ আরও বলেন, আধুনিকায়নশীল আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর বিমানবন্দর, হোটেল ও বন্দর লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালানোও কাকতালীয় নয়।

তার ভাষায়, “তারা উন্মুক্ততা, সংহতি এবং আব্রাহাম চুক্তির অবকাঠামোর ওপর আঘাত হানছে—এটি ছিল পুরোনো মধ্যপ্রাচ্যের নতুন মধ্যপ্রাচ্যের ওপর আক্রমণ।” খামেনির মৃত্যু, আশা করা যায়, মধ্যপ্রাচ্যকে ‘প্রতিরোধ’-কেন্দ্রিক নয়, বরং অন্তর্ভুক্তি ও সংহতিকে ভিত্তি করে সংজ্ঞায়িত করার পথে বাধা দূর করবে।

এতে খামেনি ও তার পূর্বসূরি মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সেই দ্বৈত খেলারও অবসান ঘটতে পারে—যেখানে তারা একদিকে প্রকাশ্যে “আমেরিকার মৃত্যু” ও “ইসরায়েলের মৃত্যু” স্লোগান দিতেন, অন্যদিকে ডেনমার্কের মতো আচরণ পাওয়ার দাবি করতেন বা “শান্তিপূর্ণ” উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার চাইতেন।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু শেষ পর্যন্ত সেই খেলাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।

ইরানি জনগণ দ্রুত ঐক্যবদ্ধ হয়ে শাসন উৎখাত করবে—এমন সম্ভাবনা আপাতত স্পষ্ট নয়, বিশেষ করে সুস্পষ্ট নেতৃত্ব ও অভিন্ন কর্মসূচি ছাড়া।

আমার সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য ফল হতে পারে “ইসলামিক রিপাবলিক ২.০”—যেখানে শাসনের ভেতরের সংস্কারপন্থীরা, যেমন সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পারমাণবিক আলোচক জাভাদ জারিফ, অবশিষ্ট নেতৃত্বকে ট্রাম্পের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে চাপ দেবেন। সেই চুক্তিতে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি, প্রক্সি যুদ্ধ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সীমা মেনে নেবে—বিনিময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও শাসনের টিকে থাকার নিশ্চয়তা পাবে।

এমন শাসন হয়তো ভবিষ্যতে প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপান্তরের তদারকি করতে পারে। কিন্তু এতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে যে তিনি এমন এক শাসনকে লাইফলাইন দিয়েছেন, যারা সম্প্রতি অন্তত ৬,৮০০ বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে—এবং প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু করা তুলনামূলক সহজ ছিল; শেষ করা সহজ হবে না।

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, তেলের দামের ঊর্ধ্বগতিজনিত মন্দা বা ইরানের ভেঙে পড়া এড়াতে ট্রাম্পের কাছে এমন চুক্তি আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। তাই তিনি যখন বলেন, “তারা কথা বলতে চায়, আমিও রাজি হয়েছি”—তা আমাকে বিস্মিত করেনি।

মধ্যপ্রাচ্যে স্বৈরতন্ত্রের বিপরীত সবসময় গণতন্ত্র নয়; অনেক সময় তা বিশৃঙ্খলা। স্বৈরশাসন ভেঙে গেলে রাষ্ট্র হয় ভেতর থেকে ধসে পড়ে, যেমন লিবিয়ায় হয়েছে, অথবা বিস্ফোরিত হয়, যেমন সিরিয়ায় হয়েছে।

ইরানের জনসংখ্যার মাত্র প্রায় ৬০ শতাংশ পারস্যভাষী। বাকি ৪০ শতাংশ আজারি, কুর্দি, লুর, আরব ও বালুচসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী। দীর্ঘ অস্থিরতা এদের বিচ্ছিন্নতার পথ তৈরি করতে পারে এবং ইরান কার্যত ভেঙে যেতে পারে।

তাতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। ইরানের প্রতিদিনের ১৬ লাখ ব্যারেল রপ্তানি বিশ্ববাজার থেকে হারিয়ে যাবে। বিশ্ব তেলবাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়—ইরান তা বন্ধ করে দিতে পারে। ইতিমধ্যে উপসাগরে বহু তেলবাহী জাহাজ আটকে আছে।

বেইজিংয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং হয়তো ভাবছেন, তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত অস্ত্রের বিরুদ্ধে তার অস্ত্রব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, যখন দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সহজেই ধ্বংস করেছে। হয়তো তাইওয়ান আক্রমণের জন্য এটি ভালো সময় নয়।

একই সঙ্গে বেইজিং ভাবতে পারে, খামেনির মৃত্যুকে ঘিরে ইরানের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত উদযাপন দেখে—এত বছর তেল কিনে সেই শাসনকে সমর্থন করা কতটা সঠিক ছিল।

২০২৬ সালের ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন এই যুদ্ধের প্রভাবে কীভাবে বদলাবে—তা এখনই বলা কঠিন।

ট্রাম্প চান না তার নামের সঙ্গে “অচলাবস্থা” শব্দটি যুক্ত হোক। নেতানিয়াহু ইরান ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে আগাম নির্বাচন ডাকতে পারেন। তবে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য তাকে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক কাঠামোয় আলোচনায় ফিরতে হবে।

সুযোগ বড় হতে পারে। ইসলামিক রিপাবলিক পতন বা দুর্বল হলে সৌদি আরব, লেবানন, সিরিয়া, ওমান, কাতার, কুয়েত এমনকি ইরাকও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারে—যদি গাজা বা পশ্চিম তীর সংযুক্ত না করা হয় এবং পৃথক রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান মেনে নেওয়া হয়। নেতানিয়াহু কি সেই সুযোগ নেবেন? না নিলে ভোটাররা কি তাকে শাস্তি দেবেন?

তবে আমি হয়তো আগেভাগেই অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছি। বুধবারের মধ্যে হয়তো আরও নতুন প্রশ্ন মাথায় আসবে। কারণ ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর এটাই মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত মুহূর্ত। এখানে সবকিছু—এমনকি তার বিপরীত ঘটনাও—সম্ভব।

জনপ্রিয় সংবাদ

ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধকে কীভাবে ভাবা উচিত

ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধকে কীভাবে ভাবা উচিত

০৮:০০:৩৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে ভাবতে হলে আপনাকে একই সঙ্গে একাধিক ধারণা মাথায় রাখতে হবে। এটি জটিল ও রঙিন কাচের নকশার মতো পরিবর্তনশীল একটি অঞ্চল, যেখানে ধর্ম, তেল, গোষ্ঠীগত রাজনীতি এবং পরাশক্তির রাজনীতি প্রতিটি বড় ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। আপনি যদি সাদা-কালো সরল বর্ণনা খুঁজে থাকেন, তবে অন্য কিছু বেছে নেওয়াই ভালো। তাই আজকের জন্য ইরান নিয়ে আমার চারটি ভাবনা তুলে ধরছি।

প্রথমত, তেহরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা উৎখাতের এই প্রচেষ্টা সফল হোক—আমি তা কামনা করি। এই শাসন নিজেদের জনগণকে হত্যা করেছে, প্রতিবেশী দেশগুলোকে অস্থিতিশীল করেছে এবং এক মহান সভ্যতাকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে। তেহরানের ইসলামি শাসনের পরিবর্তে এমন নেতৃত্ব এলে, যারা একান্তভাবে ইরানের জনগণকে নিজেদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশ এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রকৃত কণ্ঠস্বর দেওয়ার দিকে মনোযোগ দেবে, তবে সেটিই হবে এমন একটি একক ঘটনা যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে আরও মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পথে এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখবে।

দ্বিতীয়ত, এটি সহজ হবে না। এই শাসন গভীরভাবে প্রোথিত এবং কেবল আকাশপথে হামলা চালিয়ে একে সরানো সম্ভব নয়। ইসরায়েল দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্মম বিমান ও স্থলযুদ্ধ চালিয়েও গাজায় হামাসকে নির্মূল করতে পারেনি—আর হামাস তো একেবারে পাশের অঞ্চলেই। তা সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই হামলা যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আহ্বান অনুযায়ী ইরানি জনগণের বিদ্রোহ সৃষ্টি না-ও করে, তবুও এর অপ্রত্যাশিত ইতিবাচক ফল হতে পারে—যেমন একটি অনেক কম হুমকিস্বরূপ “ইসলামিক রিপাবলিক ২.০”। তবে একইভাবে অপ্রত্যাশিত বিপদও তৈরি হতে পারে—যেমন ইরান একটি একক ভৌগোলিক রাষ্ট্র হিসেবে ভেঙে পড়া।

তৃতীয়ত, আমাদের মনে রাখতে হবে এই যুদ্ধের সমাপ্তির সময় নির্ধারণ করবে কেবল ইরানের ভেতরের সামরিক পরিস্থিতি নয়; তেলবাজার ও আর্থিক বাজারও সমান ভূমিকা রাখবে। ইরান অর্থনৈতিক ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তাদের মুদ্রার মূল্য প্রায় অর্থহীন। রাশিয়ার গ্যাস ক্রয় বন্ধ করার পর ইউরোপ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি থেকে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি ট্রাম্পের সমর্থকদের ক্ষুব্ধ করতে পারে, যাদের অনেকেই আরেকটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া পছন্দ করেন না। অনেকেই চাইবেন যুদ্ধটি সংক্ষিপ্ত হোক—এটি ট্রাম্প ও তেহরানের আলোচনার ধরন ও সময়কে প্রভাবিত করবে।

চতুর্থত, ইরানে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এই যুদ্ধ যেন আমাদের যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প বা ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কারণে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের ওপর যে হুমকি তৈরি হয়েছে, তা ভুলিয়ে না দেয়। ট্রাম্প তেহরানে এসব আদর্শ প্রচারের কথা বলছেন, অথচ আমার নিজ অঙ্গরাজ্য মিনেসোটায় তার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ দুই মাস ধরে আইনি সীমাবদ্ধতার তোয়াক্কা না করেই অভিযান চালিয়েছে, এবং তিনি পরবর্তী নির্বাচনে কারা ভোট দিতে পারবে তা সীমিত করার ধারণাও ভাসাচ্ছেন। ইরান যুদ্ধ যদি নেতানিয়াহুকে এ বছরের নির্ধারিত নির্বাচনে জিততে সাহায্য করে, তবে তা পশ্চিম তীর সংযুক্তকরণ, ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টকে দুর্বল করা এবং ইসরায়েলকে একপ্রকার বর্ণভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করতে পারে—যা ইরানের বাইরেও অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য বড় ধাক্কা হবে।

US strikes Iran: Trump's war, briefly explained | Vox

মতামত লেখকের জীবন সহজ হতো যদি প্রতিটি যুদ্ধ হতো আমেরিকার গৃহযুদ্ধের মতো এবং প্রতিটি নেতা হতেন আব্রাহাম লিংকনের মতো। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। তাই এই চারটি ভাবনা নিয়ে একটু গভীরে যাই।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্যাম্পাসের বামপন্থী বক্তব্য শুনলে বোঝা যেত না, কিন্তু ১৯৭৯ সাল থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানই এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। তারা সিরিয়া, লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেন—এই চারটি আরব রাষ্ট্রে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে প্রক্সি গোষ্ঠী গড়ে তুলেছে এবং সেখানে উদার সংস্কারপন্থীদের দুর্বল করতে সাম্প্রদায়িক বিভাজন উসকে দিয়েছে।

গত দুই বছরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর আঘাতে তেহরান শাসন দুর্বল হয়েছে, যার ফলে সিরিয়ায় ইরান-সমর্থিত আসাদ সরকারের পতন ঘটেছে এবং লেবানন হিজবুল্লাহর শক্ত গ্রিপ থেকে কিছুটা মুক্ত হয়েছে। এর ফলে সেখানে বহু দশকের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই কারণেই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু অঞ্চলজুড়ে নীরবে বা প্রকাশ্যে উদযাপিত হচ্ছে।

এ ছাড়া ইরানের জনগণ অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে পশ্চিমপন্থী বলে বিবেচিত। যদি সেই প্রবণতা প্রকাশ পায় এবং শাসনের ছড়ানো বিভাজনমূলক উগ্র ইসলামি বিষকে প্রতিস্থাপন করে, তবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

লেবানন-আমিরাতি কৌশলবিদ নাদিম কোটেইচ আমাকে বলেছিলেন, কারণ ছাড়া নয় যে ইরানে শাসনবিরোধী বিক্ষোভকারীদের অন্যতম জনপ্রিয় স্লোগান ছিল: “না গাজা, না লেবানন—আমার জীবন ইরানের জন্য।” বহু ইরানি ক্ষুব্ধ হয়েছেন দেখে যে তাদের সম্পদ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াইরত মিলিশিয়াদের পেছনে নষ্ট হচ্ছে। কোটেইচ আরও বলেন, আধুনিকায়নশীল আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর বিমানবন্দর, হোটেল ও বন্দর লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালানোও কাকতালীয় নয়।

তার ভাষায়, “তারা উন্মুক্ততা, সংহতি এবং আব্রাহাম চুক্তির অবকাঠামোর ওপর আঘাত হানছে—এটি ছিল পুরোনো মধ্যপ্রাচ্যের নতুন মধ্যপ্রাচ্যের ওপর আক্রমণ।” খামেনির মৃত্যু, আশা করা যায়, মধ্যপ্রাচ্যকে ‘প্রতিরোধ’-কেন্দ্রিক নয়, বরং অন্তর্ভুক্তি ও সংহতিকে ভিত্তি করে সংজ্ঞায়িত করার পথে বাধা দূর করবে।

এতে খামেনি ও তার পূর্বসূরি মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সেই দ্বৈত খেলারও অবসান ঘটতে পারে—যেখানে তারা একদিকে প্রকাশ্যে “আমেরিকার মৃত্যু” ও “ইসরায়েলের মৃত্যু” স্লোগান দিতেন, অন্যদিকে ডেনমার্কের মতো আচরণ পাওয়ার দাবি করতেন বা “শান্তিপূর্ণ” উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার চাইতেন।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু শেষ পর্যন্ত সেই খেলাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।

ইরানি জনগণ দ্রুত ঐক্যবদ্ধ হয়ে শাসন উৎখাত করবে—এমন সম্ভাবনা আপাতত স্পষ্ট নয়, বিশেষ করে সুস্পষ্ট নেতৃত্ব ও অভিন্ন কর্মসূচি ছাড়া।

আমার সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য ফল হতে পারে “ইসলামিক রিপাবলিক ২.০”—যেখানে শাসনের ভেতরের সংস্কারপন্থীরা, যেমন সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পারমাণবিক আলোচক জাভাদ জারিফ, অবশিষ্ট নেতৃত্বকে ট্রাম্পের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে চাপ দেবেন। সেই চুক্তিতে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি, প্রক্সি যুদ্ধ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সীমা মেনে নেবে—বিনিময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও শাসনের টিকে থাকার নিশ্চয়তা পাবে।

এমন শাসন হয়তো ভবিষ্যতে প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপান্তরের তদারকি করতে পারে। কিন্তু এতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে যে তিনি এমন এক শাসনকে লাইফলাইন দিয়েছেন, যারা সম্প্রতি অন্তত ৬,৮০০ বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে—এবং প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু করা তুলনামূলক সহজ ছিল; শেষ করা সহজ হবে না।

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, তেলের দামের ঊর্ধ্বগতিজনিত মন্দা বা ইরানের ভেঙে পড়া এড়াতে ট্রাম্পের কাছে এমন চুক্তি আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। তাই তিনি যখন বলেন, “তারা কথা বলতে চায়, আমিও রাজি হয়েছি”—তা আমাকে বিস্মিত করেনি।

মধ্যপ্রাচ্যে স্বৈরতন্ত্রের বিপরীত সবসময় গণতন্ত্র নয়; অনেক সময় তা বিশৃঙ্খলা। স্বৈরশাসন ভেঙে গেলে রাষ্ট্র হয় ভেতর থেকে ধসে পড়ে, যেমন লিবিয়ায় হয়েছে, অথবা বিস্ফোরিত হয়, যেমন সিরিয়ায় হয়েছে।

ইরানের জনসংখ্যার মাত্র প্রায় ৬০ শতাংশ পারস্যভাষী। বাকি ৪০ শতাংশ আজারি, কুর্দি, লুর, আরব ও বালুচসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী। দীর্ঘ অস্থিরতা এদের বিচ্ছিন্নতার পথ তৈরি করতে পারে এবং ইরান কার্যত ভেঙে যেতে পারে।

তাতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। ইরানের প্রতিদিনের ১৬ লাখ ব্যারেল রপ্তানি বিশ্ববাজার থেকে হারিয়ে যাবে। বিশ্ব তেলবাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়—ইরান তা বন্ধ করে দিতে পারে। ইতিমধ্যে উপসাগরে বহু তেলবাহী জাহাজ আটকে আছে।

বেইজিংয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং হয়তো ভাবছেন, তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত অস্ত্রের বিরুদ্ধে তার অস্ত্রব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, যখন দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সহজেই ধ্বংস করেছে। হয়তো তাইওয়ান আক্রমণের জন্য এটি ভালো সময় নয়।

একই সঙ্গে বেইজিং ভাবতে পারে, খামেনির মৃত্যুকে ঘিরে ইরানের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত উদযাপন দেখে—এত বছর তেল কিনে সেই শাসনকে সমর্থন করা কতটা সঠিক ছিল।

২০২৬ সালের ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন এই যুদ্ধের প্রভাবে কীভাবে বদলাবে—তা এখনই বলা কঠিন।

ট্রাম্প চান না তার নামের সঙ্গে “অচলাবস্থা” শব্দটি যুক্ত হোক। নেতানিয়াহু ইরান ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে আগাম নির্বাচন ডাকতে পারেন। তবে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য তাকে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক কাঠামোয় আলোচনায় ফিরতে হবে।

সুযোগ বড় হতে পারে। ইসলামিক রিপাবলিক পতন বা দুর্বল হলে সৌদি আরব, লেবানন, সিরিয়া, ওমান, কাতার, কুয়েত এমনকি ইরাকও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারে—যদি গাজা বা পশ্চিম তীর সংযুক্ত না করা হয় এবং পৃথক রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান মেনে নেওয়া হয়। নেতানিয়াহু কি সেই সুযোগ নেবেন? না নিলে ভোটাররা কি তাকে শাস্তি দেবেন?

তবে আমি হয়তো আগেভাগেই অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছি। বুধবারের মধ্যে হয়তো আরও নতুন প্রশ্ন মাথায় আসবে। কারণ ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর এটাই মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত মুহূর্ত। এখানে সবকিছু—এমনকি তার বিপরীত ঘটনাও—সম্ভব।