শারজাহয়ে হৃদ্রোগে মারা যাওয়া ১৭ বছর বয়সী এক ভারতীয় প্রবাসী শিক্ষার্থী ছিলেন নিয়মিত ফুটবল খেলোয়াড় ও সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তার কোনো হৃদ্রোগজনিত অসুস্থতা বা পারিবারিক ইতিহাস ছিল না। হঠাৎ এই মৃত্যু পরিবার ও পুরো কমিউনিটিকে শোকস্তব্ধ করে দিয়েছে।
হঠাৎ অসুস্থতা ও মৃত্যু
শারজাহয়ে বসবাসরত ওই শিক্ষার্থীর নাম আয়েশা মারিয়াম। বৃহস্পতিবার হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার আগের রাতটি ছিল আনন্দে ভরা। তিনি কাজিনদের সঙ্গে গান ও নাচে মেতে ছিলেন।
রাত গভীর হলে সবাই নিজ নিজ বাসায় ফিরে যান। আয়েশা ভোররাতে ঘুমাতে যান এবং দুপুরের দিকে ঘুম থেকে উঠে সরাসরি বাথরুমে যান। দীর্ঘ সময় বের না হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে অচেতন অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। শরীরে কোনো বাহ্যিক আঘাত বা রক্তক্ষরণের চিহ্ন ছিল না।
চিকিৎসা প্রচেষ্টা ব্যর্থ
পরিবার দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করলেও কাছের একটি বেসরকারি হাসপাতাল মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে হওয়ায় নিজ গাড়িতেই তাকে সেখানে নেওয়া হয়। পথেই তার বাবা সিপিআর দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত্যু সনদ অনুযায়ী, বিকেল ৩টা ১৩ মিনিটে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া উল্লেখ করা হয়েছে, সঙ্গে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হওয়াকে সহায়ক কারণ হিসেবে বলা হয়েছে।
পরিবার ও পটভূমি
আয়েশা ছিলেন তিন ভাইবোনের মধ্যে বড়। বাবা-মা ছাড়াও তার রয়েছে ১১ বছরের এক ভাই ও দুই বছরের এক বোন। পরিবারটি ভারতের কেরালা রাজ্যের বাসিন্দা। আগে তারা আল আইন শহরে থাকতেন, কয়েক বছর আগে শারজাহর আল ফায়হা এলাকায় বসবাস শুরু করেন।
তিনি শারজাহ ইন্ডিয়ান স্কুলের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন এবং নবম শ্রেণি থেকেই ওই স্কুলে পড়াশোনা করছিলেন।
সব দিকেই পারদর্শী
পরিবারের সদস্যরা জানান, আয়েশা পড়াশোনা, খেলাধুলা ও শিল্পকলায় সমানভাবে দক্ষ ছিলেন। তিনি নিয়মিত স্কুল ফুটবল দলে খেলতেন এবং বিভিন্ন ম্যাচে অংশ নিতেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান শিল্পী।
আইনি প্রক্রিয়া ও দেশে ফেরানো
পরিবারটি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সব প্রক্রিয়া শেষ হলে তার মরদেহ দেশে পাঠানো হবে। পরিবারের সদস্যরা জানান, আইনি কাজ শেষ হলে বাবা ও এক চাচা মরদেহ নিয়ে কেরালায় যাবেন। এরই মধ্যে আয়েশার মা, ভাইবোনসহ ঘনিষ্ঠ স্বজনদের কেরালায় পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
কমিউনিটিতে শোক
শারজাহ ইন্ডিয়ান স্কুল পরিচালনাকারী ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন শারজাহের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সংগঠনের সভাপতি জানান, এই মৃত্যু পুরো ভারতীয় কমিউনিটিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এটি দ্বিতীয় কোনো ভারতীয় কিশোর শিক্ষার্থীর হৃদ্রোগে মৃত্যুর ঘটনা। এর আগে দুবাইয়ে ১৮ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী উৎসবের সময় নাচতে গিয়ে হঠাৎ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
চিকিৎসকদের সতর্কতা
চিকিৎসকদের মতে, শিশু ও কিশোরদের মধ্যে এমন ঘটনা খুবই বিরল হলেও অনেক ক্ষেত্রে অজানা হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকে। প্রতি বছর প্রতি এক লাখ শিশুর মধ্যে এক থেকে দুই জনের এমন ঝুঁকি দেখা যায়।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানান, খেলাধুলার সময় মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বুকে ব্যথা, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা হঠাৎ লুটিয়ে পড়া হৃদ্রোগের সতর্ক সংকেত হতে পারে। প্রতিযোগিতামূলক খেলায় যুক্ত কিশোরদের নিয়মিত হৃদ্যন্ত্র পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তারা, বিশেষ করে যদি পরিবারে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















