আগের লেখায় আমি সিউলের এমন একটি এলাকার কথা লিখেছিলাম, যেখানে উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নেই—ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিকতার ছোঁয়া থাকা বুকচন এলাকা। উঁচু অ্যাপার্টমেন্টবিহীন একটি এলাকার কথা লিখতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সিউলে উচ্চ ভবনের অ্যাপার্টমেন্টের ইতিহাস নিয়ে ভাবতে শুরু করি।
আমি যখন ১৯৬৫ সালে প্রথম কোরিয়ায় আসি, তখন প্রতিটি পাড়া ছিল বুকচনের মতো। একতলা হানোক আর ষাটের দশকে তৈরি হওয়া দুইতলা ‘নতুন’ বাড়ি। পাঁচতলা ভবন তখনো আসেনি—সেগুলো পরে এসেছে। লিফট ছিল না, তবে চার ও পাঁচতলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবন দেখা যেত। নিউইয়র্কে এ ধরনের ভবনকে বলা হয় ‘ওয়াক-আপ’, অর্থাৎ লিফটবিহীন অ্যাপার্টমেন্ট।
১৯৬৮ সালের একটি ঘটনা এখনো মনে আছে। তখন পাঁচতলা ওয়াক-আপ অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি হচ্ছিল। হান নদীর তীরে মাপো বা ইয়ংসানে নতুন ও আধুনিক এমন একটি অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প গড়ে উঠছিল। নদীর স্রোতে তীর ভেঙে যেতে থাকে, ভবনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সেগুলো নদীতে ধসে পড়ে। সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আমার সবচেয়ে বেশি মনে আছে তখনকার আমাদের কর্মসূচির পরিচালকের স্ত্রীর একটি মন্তব্য। তিনি বলেছিলেন, ‘কোনোভাবে এ মানুষগুলোকে একে অপরের ওপর বসবাস করতে শিখতেই হবে।’
তখন কথাটি যেমন অদ্ভুত, তেমনি অর্থবহ মনে হয়েছিল। আজ সিউলের দিকে তাকালে, সারি সারি উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স দেখে মনে হয়, কোরিয়ানরা সত্যিই ‘একে অপরের ওপর বসবাস করতে’ শিখে গেছে।
উচ্চ ভবনের অ্যাপার্টমেন্টের উত্থান নগরায়ণের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ১৯৬৫ সালে কোরিয়া ছিল ২০ শতাংশ নগর আর ৮০ শতাংশ গ্রামভিত্তিক দেশ। মানুষের ছিল ‘গোহিয়াং’, অর্থাৎ নিজস্ব জন্মভূমি বা গ্রাম। সিউলে খুব কম মানুষই আসলে সিউলের বাসিন্দা ছিল। অধিকাংশের শিকড় ছিল গ্রামে। আমার মনে হয়, এই ধারণাটি আজকের কোরিয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এখন দেশটি ৯০ শতাংশ নগর ও মাত্র ১০ শতাংশ গ্রামভিত্তিক। গ্রামগুলো দুঃখজনকভাবে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। কোনো গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ হওয়া আর খবর নয়। এটি দুঃখজনক, কিন্তু স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুল ভবনগুলোকে অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। শিশু নেই। মানুষ কাছাকাছি শহরে চলে যাচ্ছে, অথবা দম্পতিরা সন্তান নিচ্ছে না। একসময়ের প্রাণবন্ত গ্রামগুলো এখন ফাঁকা ও মৃতপ্রায়।
অন্যদিকে, সিউল ও অন্যান্য শহরে অ্যাপার্টমেন্ট ভবনগুলো আরও উঁচু হচ্ছে। সত্তরের দশকে বানপো এলাকার অ্যাপার্টমেন্ট ছিল বসবাসের জন্য সবচেয়ে ফ্যাশনেবল স্থানগুলোর একটি। উচ্চপদস্থ পেশাজীবীরা সেখানে থাকতেন। এখন সেগুলো সব ভেঙে ফেলা হয়েছে, নতুন আবাসন তৈরি হচ্ছে। তখনকার ভবনগুলো সম্ভবত দশতলা ছিল এবং লিফট ছিল। পাঁচতলা ওয়াক-আপের এক ধাপ ওপরে।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে আরও উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট দেখা গেল—১৭ তলা, ২৫ তলা। এখন তো ৫০ তলা আবাসিক ভবনও দেখা যায়। কোরিয়ায় আকাশচুম্বী ভবনের সংখ্যা বেশ বেশি। আকাশচুম্বী ভবনের একটি সংজ্ঞা আছে। আমি খুঁজে দেখেছি—১২ তলার বেশি হলে তাকে উচ্চ ভবন বলা হয়, আর ৪০ তলার বেশি হলে আকাশচুম্বী। কেউ কেউ আবার বলছেন, সত্যিকারের আকাশচুম্বী হতে হলে ৭০ তলার বেশি হতে হবে।
দেশভিত্তিক আকাশচুম্বী ভবনের একটি তালিকা আছে। সেখানে চীন প্রথম, তিন হাজার তিনশোর বেশি ভবন নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয়, প্রায় ৯০০টি। জাপান পঞ্চম, প্রায় ২৮০টি, আর কোরিয়া ষষ্ঠ, প্রায় ২৭০টি। কোরিয়ায় এসব ভবনের প্রায় ৭০ শতাংশই আবাসনের জন্য ব্যবহৃত হয়। যদিও কিছু ভবন অফিস ও বাসস্থানের মিশ্রণে ব্যবহৃত হওয়ায় সঠিক হিসাব করা কঠিন।
![Weekender] How Seoul became apartment-ized - The Korea Herald](https://wimg.heraldcorp.com/content/default/2019/01/10/20190110000892_0.jpg)
কোরিয়ায় ক্রমেই উঁচু ভবন গড়ে উঠতে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে আমার একটি ব্যক্তিগত উপলব্ধি হলো—এ দেশ যেন সব সময়ই নির্মাণের মধ্যে থাকে। একবার এক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোরিয়ার জাতীয় পাখি কী। আমেরিকার আছে ঈগল। কোরিয়ার কী? অনেকেই বলবেন, ম্যাগপাই—তা ঠিকই। কিন্তু আমার বন্ধু তখন আমাদের সামনে দেখা নির্মাণস্থলের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, ‘এটাই জাতীয় পাখি।’ অর্থাৎ নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ক্রেন—শব্দের খেলায় একটি রসিকতা।
আরেকটি বিষয় আমি লক্ষ্য করেছি, উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের নামকরণ। শুরুর দিকে ভবনগুলোর নাম ছিল মর্যাদাপূর্ণ চীনা অক্ষরভিত্তিক। হুন্দে বা দংবাংয়ের মতো নাম খুবই প্রচলিত ছিল। অনেক সময় বিশাল আকারে সেই নাম ভবনের গায়ে লেখা থাকত।
এরপর সম্ভবত নব্বইয়ের দশকে খাঁটি কোরিয়ান শব্দে নামকরণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যেমন গায়েনারি, মুজিগে বা জিন্দাল্লে—ফুল বা প্রকৃতিনির্ভর নাম।
বর্তমানে সবচেয়ে অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট বা কন্ডোমিনিয়ামগুলোর নাম শোনা যায় বিদেশি ধাঁচের—কখনো ইংরেজি, কখনো ফরাসি বা ইতালীয় ধাঁচে। এমন সব নাম যে উচ্চারণ করাই কঠিন। এ নিয়ে এখন একটি প্রচলিত রসিকতাও আছে। বলা হয়, নামগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই কঠিন রাখা হয়, যাতে পুত্রবধূ এমন জায়গা বেছে নিতে পারেন, যেখানে শাশুড়ি নাম উচ্চারণ করতে না পেরে বেড়াতে আসতে পারবেন না। পুত্রবধূর স্বপ্নের পরিস্থিতি।
লেখক: মার্ক পিটারসন যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের ব্রিগাম ইয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের কোরিয়ান স্টাডিজ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক।
মার্ক পিটারসন 


















