২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে এসে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার হাল ধরার দায়িত্বে থাকা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে ঘিরে সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে। সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানোর বহু আশ্বাস, সংস্কারের কথা ও নিয়মিত পর্যালোচনা বৈঠক সত্ত্বেও বছরজুড়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন নেমে এসেছে রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে। দীর্ঘসূত্রতা, অর্থ খরচে ধীরগতি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ায় সক্ষমতা, সমন্বয় ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাস্তবায়নের গতি কেন থমকে গেল
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সরকারি হিসাব বলছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রথম এগারো মাসে উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন পঞ্চান্ন শতাংশের নিচে ছিল। সাধারণত এই সময়ে বাস্তবায়ন পঁয়ষট্টি থেকে সত্তর শতাংশে পৌঁছায়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন একাধিক দপ্তরে বাস্তবায়ন অর্ধেকেরও কম থাকায় এটি সাময়িক বিলম্ব নয়, বরং কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
পরিকল্পনা ছিল, প্রস্তুতি ছিল না

বছরের দ্বিতীয়ার্ধে সাধারণত কাজের গতি বাড়লেও ২০২৫ সালে তা হয়নি। মাসভিত্তিক ব্যয় ছিল শ্লথ, শেষদিকে হঠাৎ খরচ বাড়ার চিরচেনা দৃশ্যও অনুপস্থিত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থের অভাব নয়; প্রকল্প প্রস্তুতি, ক্রয় পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলার ঘাটতিই মূল সমস্যা।
নির্দেশনা ছিল, ফল ছিল সীমিত
সারা বছর একাধিক পর্যালোচনা সভা হয়েছে, ধীরগতির প্রকল্প পরিচালকদের তাগাদা দেওয়া হয়েছে। তবু কার্যকর শাস্তি বা নেতৃত্ব পরিবর্তন না হওয়ায় একই প্রকল্প বারবার ধীরগতির তালিকায় রয়ে গেছে। সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সমস্যা চিহ্নিত হলেও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না।
বড় প্রকল্পেও জট
ভূমি অধিগ্রহণে জট, নকশা পরিবর্তন, ঠিকাদারি অদক্ষতা ও বৈদেশিক ঋণ ছাড়ে বিলম্ব বড় প্রকল্পগুলোকে ভুগিয়েছে। বছরজুড়ে সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে একাধিক সংশোধন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা অনেকের মতে ব্যতিক্রমী সমাধান নয়, বরং নিয়মিত ক্ষতি সামলানোর পথ।

অর্থনীতিতে প্রভাব
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা ও বৈদেশিক চাপের সময়ে কার্যকর সরকারি বিনিয়োগ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার কথা ছিল। কিন্তু উন্নয়ন খাতে কম খরচে কর্মসংস্থান ও সেবা সম্প্রসারণে প্রত্যাশিত প্রভাব আসেনি, বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বলে।
বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার ঘাটতি
প্রতি বছর বড় অঙ্কের বরাদ্দ অনুমোদন হলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতার সঙ্গে তার ফারাক বাড়ছে। প্রকল্প অনুমোদনের সময় সমীক্ষা তাড়াহুড়োয় সারা হয়, প্রস্তুতি দুর্বল থাকে, ফলে কাজ শুরুতেই বিলম্ব অনিবার্য হয়ে ওঠে।

জবাবদিহির প্রশ্ন
একাধিক প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা পরিচালকদের ক্ষেত্রে দেরি বা ব্যয় বাড়লেও তেমন পরিণতি দেখা যায় না। পেশাদার প্রকল্প ব্যবস্থাপনা কাঠামোর কথা বহুদিনের আলোচনায় থাকলেও ২০২৫ সালেও দৃশ্যমান সংস্কার হয়নি। পর্যবেক্ষক সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ নিয়মিত সতর্ক করলেও প্রয়োগক্ষমতার অভাবে সুপারিশ উপেক্ষিত থেকে যায়।
শেষ কথা
বছর শেষে বাস্তবায়নের রেকর্ড নিম্ন হার, থমকে থাকা সংস্কার ও পরিকল্পনা-বাস্তবায়নের ফাঁক স্পষ্ট। বাস্তবসম্মত কর্মসূচি নির্ধারণ, কঠোর জবাবদিহি ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই চক্র ভাঙা কঠিন। ২০২৫ সাল তাই স্মরণীয় হয়ে থাকবে অপূর্ণতা আর হাতছাড়া সুযোগের বছর হিসেবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















