ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় টুপটাপ শব্দ, থামে গভীর রাত পেরিয়ে। ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়-জুড়ে ছড়িয়ে পড়া নতুন পিকলেবল কোর্ট গুলোতে এই শব্দ এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। কেউ খেলাটিকে ভালোবাসছে, আবার হাজারো বাসিন্দার কাছে এই শব্দ রীতিমতো অসহ্য হয়ে উঠেছে। শব্দ দূষণের অভিযোগে ক্ষুব্ধ মানুষ আবেদন জানাচ্ছেন, কর্তৃপক্ষের কাছে দিচ্ছেন লিখিত অভিযোগ। রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম ইতিমধ্যে খেলাটিকে আখ্যা দিয়েছে শব্দ ঝুঁকিপূর্ণ খেলাধুলা হিসেবে।
আবাসিক এলাকায় কোর্ট, ঘুমহীন রাত
ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গলি আর উঁচু ভবনের মাঝখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য পিকলবল কোর্ট। ফলে একই সঙ্গে শত শত মানুষ শব্দের প্রভাব ভোগ করছেন। হ্যানয়ের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে একাধিক কোর্টের পাশেই বসবাস করা চুয়াল্লিশ বছর বয়সী হোয়া নুয়েন বলেন, মাঝরাতে খেলাও বন্ধ হয় না। এই শব্দে তার ঘুম নষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন। তিনি স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জমা দিয়েছেন, কিন্তু এখনো কার্যকর সমাধান পাননি।

রাষ্ট্রায়ত্ত সূত্র জানায়, রাজধানীর নাগরিক অভিযোগ গ্রহণের ডিজিটাল ব্যবস্থায় জমা পড়া অধিকাংশ শব্দদূষণ অভিযোগই পিকলেবল কেন্দ্রিক। কোর্টের আশেপাশে ভিড়, গাড়ির হর্ন, দর্শকদের চিৎকার—সব মিলিয়ে সমস্যা আরও বেড়েছে।
ব্যবসা ও পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব
শুধু রাজধানী নয়, **হো চি মিন সিটি**তেও একই চিত্র। সেখানে শ্রমিকদের একটি আবাসিক ভবনের ব্যবস্থাপক লাম থান জানান, আশপাশের কোর্টের শব্দ সহ্য করতে না পেরে অনেক ভাড়াটে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। তার ভাষায়, প্যাডেলের আঘাতের শব্দ, উল্লাস আর চিৎকার মিলিয়ে পরিস্থিতি মানসিকভাবে ক্লান্তিকর।
হ্যানয়ের এক স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থী দুওং জানায়, পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। শব্দে মাথা ফাঁকা হয়ে যায়, পড়ায় বসতে পারছে না সে।

দ্রুত জনপ্রিয়তা, দ্রুত বাড়ছে কোর্ট
খেলোয়াড় ও প্রশিক্ষকদের মতে, প্রায় দুই বছর আগে ভিয়েতনামে পিকলবলের জনপ্রিয়তা শুরু হয়। সহজ নিয়ম, হালকা প্যাডেল আর বল—সব বয়সের মানুষের জন্য খেলা সহজ হওয়ায় অল্প সময়েই ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। এশিয়ায় দ্রুততম বাজার গুলোর একটি হয়ে উঠেছে ভিয়েতনাম। আঞ্চলিক পেশাদার সার্কিটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ ইতিমধ্যে এই খেলায় যুক্ত হয়েছেন।
হ্যানয়ের লং বিয়েন এলাকাকে বলা হচ্ছে পিকলবলের কেন্দ্র। এক বছরেরও কম সময়ে সেখানে কোর্টের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। হাঁটার দূরত্বেই একাধিক ক্লাব, আর আশপাশে আরও অসংখ্য কোর্ট।

শব্দদূষণ নিয়ে স্বাস্থ্য সতর্কতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, পিকবলের শব্দ টেনিস বা ব্যাডমিন্টনের তুলনায় বেশি তীক্ষ্ণ ও উচ্চমাত্রার। জাতিসংঘের হিসাবে হো চি মিন সিটি এশিয়ার উচ্চ শব্দ দূষণ পূর্ণ শহরগুলোর একটি, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে শ্রবণশক্তি ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। জাতীয় বিধিমালায় রাতের শব্দ সীমিত রাখার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ।
রাষ্ট্রায়ত্ত স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, পিকলবলের লাগাতার শব্দ শুধু বিরক্তিকর নয়, এটি মানসিক চাপ বাড়ায়, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এবং হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। অনেক বাসিন্দা বলছেন, এই টুপটাপ শব্দ তাদের দৈনন্দিন জীবনে স্থায়ী অস্বস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমাধানের চাপ বাড়ছে
খেলাধুলা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও, সামাজিক চাপ বাড়ছে। নাগরিকেরা কোর্ট পরিচালনার সময়সীমা নির্ধারণ, শব্দনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং আবাসিক এলাকায় কোর্ট স্থাপনের নিয়ম কঠোর করার দাবি তুলছেন। পিকলবলের জনপ্রিয়তা আর নগরজীবনের শান্তির মধ্যে ভারসাম্য খোঁজাই এখন ভিয়েতনামের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















