০৩:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬
মেক্সিকোতে শক্তিশালী ভূমিকম্প, কেঁপে উঠল স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভ, সড়ক ও হাসপাতালে ক্ষতি ইউক্রেনের প্রশাসনে বড় রদবদল, প্রেসিডেন্ট দপ্তরের শীর্ষে গোয়েন্দা প্রধান বুদানোভ সুইজারল্যান্ডে নববর্ষের রাতে ভয়াবহ বার আগুন, অন্তত ৪০ জন নিহত, ইউরোপজুড়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন আহতরা নাগাল্যান্ড কীভাবে হয়ে উঠল ‘বিশ্বের ফ্যালকন রাজধানী’ দৈত্যাকার হলুদ বার্মিজ পাইথন: প্রকৃতির নীরব দৈত্য ইয়েমেনে দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের স্বাধীনতার দাবি জোরালো, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সংঘর্ষ তীব্র আশুলিয়ায় যুবলীগ নেতাকে গ্রেপ্তার, হত্যা মামলার তদন্তে অগ্রগতি মন্দিরে দানবাক্স ভেঙে নগদ টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী লুট কুমিল্লা-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল আখাউড়ায় আন্তঃনগর ট্রেন থেকে ভারতীয় শাড়ি ও কম্বল জব্দ

নাগাল্যান্ড কীভাবে হয়ে উঠল ‘বিশ্বের ফ্যালকন রাজধানী’

উত্তর-পূর্ব ভারতের নাগাল্যান্ড রাজ্যের আরি ওল্ড গ্রামের কাছের এক জলাভূমিতে ছোট কাঠের নৌকা চালাচ্ছেন পাখি পর্যবেক্ষণ গাইড জানবেমো ওডিউ। তাঁর সঙ্গে আছেন ইউরোপ থেকে আসা দুজন পাখিপ্রেমী, যাঁরা দেখতে এসেছেন পরিযায়ী আমুর ফ্যালকন।

খালি চোখে দূরের গাছগুলোকে মনে হয় ফ্যাকাশে রঙের ফুলে ভরা। হঠাৎ যেন কোনো সংকেতে হাজার হাজার আমুর ফ্যালকন একসঙ্গে উড়াল দেয়। একযোগে ডানার ঝাপটায় সৃষ্টি হয় বজ্রগর্জনের মতো শব্দ। আকাশ অন্ধকার হয়ে আসে, আর সেই দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়ে পড়েন পাখিপ্রেমীরা।

এই অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্যকে ব্রিটিশ শিকারি পাখি সংরক্ষণবিদ নিক উইলিয়ামস বর্ণনা করেছেন ‘পৃথিবীর যেকোনো স্থানে দেখা ফ্যালকনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে চমকপ্রদ আবাসস্থল’ হিসেবে। এই কারণেই নাগাল্যান্ড পেয়েছে ‘বিশ্বের ফ্যালকন রাজধানী’ নামে অনানুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

প্রতি বছর অক্টোবরের শেষ দিক থেকে ডিসেম্বরের শুরু পর্যন্ত কয়েক লক্ষ আমুর ফ্যালকন নাগাল্যান্ড ও আশপাশের রাজ্যগুলোতে এসে জড়ো হয়। তারা গাছে আশ্রয় নেয়, খাবার খায় এবং সামনে দীর্ঘ যাত্রার জন্য শক্তি সঞ্চয় করে।

২০০ গ্রামেরও কম ওজনের এই ফ্যালকন পাখিগুলো শিকারি পাখিদের মধ্যে অন্যতম দীর্ঘ পরিযাত্রা সম্পন্ন করে। তারা সাইবেরিয়া ও চীনের প্রজনন অঞ্চল থেকে উড়ে যায় আফ্রিকার পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের শীতকালীন আবাসে, আবার সেখান থেকে ফিরে আসে। মোট যাত্রাপথ প্রায় ২২ হাজার কিলোমিটার। গবেষণায় দেখা গেছে, এত ছোট শরীরের পাখি হয়েও কিছু আমুর ফ্যালকন উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কিলোমিটার পথ টানা পাঁচ দিনের মতো সময়ের মধ্যে উড়ে পাড়ি দেয়, যা সত্যিই বিস্ময়কর।

নাগাল্যান্ডের এই অঞ্চলের মানুষ বহু প্রজন্ম ধরেই জানে যে প্রতিবছর এই পাখিরা আসে। পাংটি গ্রামের বাসিন্দা লিজন ন্গুল্লি বলেন, এই গ্রাম প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তারা এখানে আসে। প্রায় এক হাজার বছর আগে গড়ে ওঠা এই গ্রামের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেই তিনি এ গল্প শুনেছেন।

তবে একসময় মানুষ জানত না পাখিগুলো ঠিক কোথায় আশ্রয় নেয়। দুই হাজার সালের শুরুর দিকে দোয়াং নদীতে একটি বাঁধ নির্মাণের পর সেখানে তৈরি হওয়া জলাধারের চারপাশে বড় বড় ঝাঁক গড়ে ওঠে। গবেষকদের ধারণা, উইপোকা ও ফড়িংসহ প্রচুর উড়ন্ত পোকামাকড় থাকার কারণেই ফ্যালকনরা এখানে আকৃষ্ট হয়।

পাংটি গ্রাম বাঁধের খুব কাছেই। কিন্তু একসময় এখানে ফ্যালকনরা নিরাপদ ছিল না। এই অঞ্চলে শিকার একটি প্রচলিত রীতি। শুরুতে গুলতি ব্যবহার করে পাখি শিকার করা হতো খাবারের জন্য। পরে এয়ারগান ব্যবহার শুরু হয় এবং প্রতিদিন ২০০টি পর্যন্ত পাখি মারা পড়ত। দুই হাজার দশকের শেষ দিকে দরিদ্র জেলেরা জলাধারের চারপাশে গাছের মাঝে জাল ঝুলিয়ে দিনে হাজার হাজার পাখি ধরতে শুরু করে।

বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী শশাঙ্ক দালভি জানান, ২০১২ সালে তারা হিসাব করে দেখেছিলেন প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ হাজার ফ্যালকন মারা যাচ্ছিল। এই হিসাবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নাগাল্যান্ডে বিশ্বব্যাপী আমুর ফ্যালকনের প্রায় ১০ শতাংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছিল।

এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। দালভির ভাষায়, নাগা জনগণের গর্বে আঘাত লাগে। তারা অনুভব করে, পুরো বিশ্ব যেন তাদের দিকে আঙুল তুলছে। এই বিষয়টিই সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রেরণা হয়ে ওঠে।

ভারত পরিযায়ী প্রজাতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশ। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ও নাগাল্যান্ড রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও শিকার বন্ধে চাপ আসে। উন্নয়ন তহবিল কমিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।

এই পরিস্থিতিতে পাংটি গ্রামের পরিষদ আমুর ফ্যালকন শিকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বেসরকারি সংস্থাগুলো সচেতনতা ও শিক্ষা কার্যক্রম চালায়। রাজ্যের প্রধান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যাপটিস্ট চার্চও সংরক্ষণ বার্তা ছড়িয়ে দিতে এগিয়ে আসে।

যাঁরা ফ্যালকন বিক্রি করে সংসার চালাতেন, তাঁরা প্রথমে অসন্তুষ্ট হন। হারানো আয়ের কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি তারা। তবু ২০১৩ সালের পর থেকে আর কোনো শিকারের ঘটনা ঘটেনি। গ্রামের আরেক বাসিন্দা নসুবেনথুং ওডিউ বলেন, একবার গ্রামপ্রধান কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটি শতভাগ কার্যকর হয়।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন গ্রামবাসীর মধ্যে গর্বের অনুভূতি তৈরি করেছে। একসময় ফ্যালকন শিকার করা জেলে ইয়ানপান শিতিরি বলেন, গ্রাম যদি উপকৃত হয়, তবে শিকার না করায় তার কোনো আপত্তি নেই।

শিশুদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে পাংটি ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামে ইকো-ক্লাব গড়ে তোলা হয়। দালভির মতে, ছেলে-মেয়েরা বাড়িতে এসে বাবা-মাকে যখন বলে এই কাজ না করতে, তখন সেটার প্রভাব অনেক বেশি হয়।

ইকো-ক্লাবে কাজ করা লিজন ন্গুল্লি বলেন, শিশুদের মাধ্যমে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হতো। এতে তারা পূর্বপুরুষদের জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরেছে। তবে করোনাভাইরাস মহামারির সময় এই ক্লাবগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং পরে আর চালু হয়নি।

পরিযাত্রার সময় পাংটিতে পাখি দেখা ও ছবি তোলার জন্য পর্যটকরা আসেন। তবে গাইড ও হোমস্টের মতো কিছু মানুষই মূলত আর্থিক লাভ পান। ডিসেম্বরের পর ফ্যালকন চলে গেলে পর্যটকরাও আর আসে না। জানবেমো ওডিউ আক্ষেপ করে বলেন, বছরের নয় মাস এখানে কেউ থাকে না।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্যাম্প ও অতিথিশালা নির্মাণের জন্য গাছ কাটার ফলে ফ্যালকনরা পাংটির মূল আবাস ছেড়ে আরি ওল্ড গ্রামের কাছের জলাভূমিতে সরে গেছে। তাদের ফিরিয়ে আনতে জেলা প্রশাসন পরিযাত্রা মৌসুমে পাংটি ও আশপাশের এলাকাকে অস্থায়ী নীরব অঞ্চল ঘোষণা করেছে।

সব সমস্যা সত্ত্বেও এক দশকের বেশি সময় ধরে এই পাখিরা নিরাপদ আছে। যারা একসময় শিকার করত, তারাও এখন দূর থেকে আনন্দের সঙ্গে ফ্যালকন দেখছে। ইয়ানপান শিতিরি হাসতে হাসতে বলেন, গ্রামের সবাই, এমনকি ছোট শিশুরাও ফ্যালকনের অপেক্ষায় থাকে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

মেক্সিকোতে শক্তিশালী ভূমিকম্প, কেঁপে উঠল স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভ, সড়ক ও হাসপাতালে ক্ষতি

নাগাল্যান্ড কীভাবে হয়ে উঠল ‘বিশ্বের ফ্যালকন রাজধানী’

১১:০৪:৩৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬

উত্তর-পূর্ব ভারতের নাগাল্যান্ড রাজ্যের আরি ওল্ড গ্রামের কাছের এক জলাভূমিতে ছোট কাঠের নৌকা চালাচ্ছেন পাখি পর্যবেক্ষণ গাইড জানবেমো ওডিউ। তাঁর সঙ্গে আছেন ইউরোপ থেকে আসা দুজন পাখিপ্রেমী, যাঁরা দেখতে এসেছেন পরিযায়ী আমুর ফ্যালকন।

খালি চোখে দূরের গাছগুলোকে মনে হয় ফ্যাকাশে রঙের ফুলে ভরা। হঠাৎ যেন কোনো সংকেতে হাজার হাজার আমুর ফ্যালকন একসঙ্গে উড়াল দেয়। একযোগে ডানার ঝাপটায় সৃষ্টি হয় বজ্রগর্জনের মতো শব্দ। আকাশ অন্ধকার হয়ে আসে, আর সেই দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়ে পড়েন পাখিপ্রেমীরা।

এই অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্যকে ব্রিটিশ শিকারি পাখি সংরক্ষণবিদ নিক উইলিয়ামস বর্ণনা করেছেন ‘পৃথিবীর যেকোনো স্থানে দেখা ফ্যালকনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে চমকপ্রদ আবাসস্থল’ হিসেবে। এই কারণেই নাগাল্যান্ড পেয়েছে ‘বিশ্বের ফ্যালকন রাজধানী’ নামে অনানুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

প্রতি বছর অক্টোবরের শেষ দিক থেকে ডিসেম্বরের শুরু পর্যন্ত কয়েক লক্ষ আমুর ফ্যালকন নাগাল্যান্ড ও আশপাশের রাজ্যগুলোতে এসে জড়ো হয়। তারা গাছে আশ্রয় নেয়, খাবার খায় এবং সামনে দীর্ঘ যাত্রার জন্য শক্তি সঞ্চয় করে।

২০০ গ্রামেরও কম ওজনের এই ফ্যালকন পাখিগুলো শিকারি পাখিদের মধ্যে অন্যতম দীর্ঘ পরিযাত্রা সম্পন্ন করে। তারা সাইবেরিয়া ও চীনের প্রজনন অঞ্চল থেকে উড়ে যায় আফ্রিকার পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের শীতকালীন আবাসে, আবার সেখান থেকে ফিরে আসে। মোট যাত্রাপথ প্রায় ২২ হাজার কিলোমিটার। গবেষণায় দেখা গেছে, এত ছোট শরীরের পাখি হয়েও কিছু আমুর ফ্যালকন উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কিলোমিটার পথ টানা পাঁচ দিনের মতো সময়ের মধ্যে উড়ে পাড়ি দেয়, যা সত্যিই বিস্ময়কর।

নাগাল্যান্ডের এই অঞ্চলের মানুষ বহু প্রজন্ম ধরেই জানে যে প্রতিবছর এই পাখিরা আসে। পাংটি গ্রামের বাসিন্দা লিজন ন্গুল্লি বলেন, এই গ্রাম প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তারা এখানে আসে। প্রায় এক হাজার বছর আগে গড়ে ওঠা এই গ্রামের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেই তিনি এ গল্প শুনেছেন।

তবে একসময় মানুষ জানত না পাখিগুলো ঠিক কোথায় আশ্রয় নেয়। দুই হাজার সালের শুরুর দিকে দোয়াং নদীতে একটি বাঁধ নির্মাণের পর সেখানে তৈরি হওয়া জলাধারের চারপাশে বড় বড় ঝাঁক গড়ে ওঠে। গবেষকদের ধারণা, উইপোকা ও ফড়িংসহ প্রচুর উড়ন্ত পোকামাকড় থাকার কারণেই ফ্যালকনরা এখানে আকৃষ্ট হয়।

পাংটি গ্রাম বাঁধের খুব কাছেই। কিন্তু একসময় এখানে ফ্যালকনরা নিরাপদ ছিল না। এই অঞ্চলে শিকার একটি প্রচলিত রীতি। শুরুতে গুলতি ব্যবহার করে পাখি শিকার করা হতো খাবারের জন্য। পরে এয়ারগান ব্যবহার শুরু হয় এবং প্রতিদিন ২০০টি পর্যন্ত পাখি মারা পড়ত। দুই হাজার দশকের শেষ দিকে দরিদ্র জেলেরা জলাধারের চারপাশে গাছের মাঝে জাল ঝুলিয়ে দিনে হাজার হাজার পাখি ধরতে শুরু করে।

বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী শশাঙ্ক দালভি জানান, ২০১২ সালে তারা হিসাব করে দেখেছিলেন প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ হাজার ফ্যালকন মারা যাচ্ছিল। এই হিসাবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নাগাল্যান্ডে বিশ্বব্যাপী আমুর ফ্যালকনের প্রায় ১০ শতাংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছিল।

এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। দালভির ভাষায়, নাগা জনগণের গর্বে আঘাত লাগে। তারা অনুভব করে, পুরো বিশ্ব যেন তাদের দিকে আঙুল তুলছে। এই বিষয়টিই সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রেরণা হয়ে ওঠে।

ভারত পরিযায়ী প্রজাতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশ। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ও নাগাল্যান্ড রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও শিকার বন্ধে চাপ আসে। উন্নয়ন তহবিল কমিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।

এই পরিস্থিতিতে পাংটি গ্রামের পরিষদ আমুর ফ্যালকন শিকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বেসরকারি সংস্থাগুলো সচেতনতা ও শিক্ষা কার্যক্রম চালায়। রাজ্যের প্রধান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যাপটিস্ট চার্চও সংরক্ষণ বার্তা ছড়িয়ে দিতে এগিয়ে আসে।

যাঁরা ফ্যালকন বিক্রি করে সংসার চালাতেন, তাঁরা প্রথমে অসন্তুষ্ট হন। হারানো আয়ের কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি তারা। তবু ২০১৩ সালের পর থেকে আর কোনো শিকারের ঘটনা ঘটেনি। গ্রামের আরেক বাসিন্দা নসুবেনথুং ওডিউ বলেন, একবার গ্রামপ্রধান কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটি শতভাগ কার্যকর হয়।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন গ্রামবাসীর মধ্যে গর্বের অনুভূতি তৈরি করেছে। একসময় ফ্যালকন শিকার করা জেলে ইয়ানপান শিতিরি বলেন, গ্রাম যদি উপকৃত হয়, তবে শিকার না করায় তার কোনো আপত্তি নেই।

শিশুদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে পাংটি ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামে ইকো-ক্লাব গড়ে তোলা হয়। দালভির মতে, ছেলে-মেয়েরা বাড়িতে এসে বাবা-মাকে যখন বলে এই কাজ না করতে, তখন সেটার প্রভাব অনেক বেশি হয়।

ইকো-ক্লাবে কাজ করা লিজন ন্গুল্লি বলেন, শিশুদের মাধ্যমে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হতো। এতে তারা পূর্বপুরুষদের জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরেছে। তবে করোনাভাইরাস মহামারির সময় এই ক্লাবগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং পরে আর চালু হয়নি।

পরিযাত্রার সময় পাংটিতে পাখি দেখা ও ছবি তোলার জন্য পর্যটকরা আসেন। তবে গাইড ও হোমস্টের মতো কিছু মানুষই মূলত আর্থিক লাভ পান। ডিসেম্বরের পর ফ্যালকন চলে গেলে পর্যটকরাও আর আসে না। জানবেমো ওডিউ আক্ষেপ করে বলেন, বছরের নয় মাস এখানে কেউ থাকে না।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্যাম্প ও অতিথিশালা নির্মাণের জন্য গাছ কাটার ফলে ফ্যালকনরা পাংটির মূল আবাস ছেড়ে আরি ওল্ড গ্রামের কাছের জলাভূমিতে সরে গেছে। তাদের ফিরিয়ে আনতে জেলা প্রশাসন পরিযাত্রা মৌসুমে পাংটি ও আশপাশের এলাকাকে অস্থায়ী নীরব অঞ্চল ঘোষণা করেছে।

সব সমস্যা সত্ত্বেও এক দশকের বেশি সময় ধরে এই পাখিরা নিরাপদ আছে। যারা একসময় শিকার করত, তারাও এখন দূর থেকে আনন্দের সঙ্গে ফ্যালকন দেখছে। ইয়ানপান শিতিরি হাসতে হাসতে বলেন, গ্রামের সবাই, এমনকি ছোট শিশুরাও ফ্যালকনের অপেক্ষায় থাকে।