বন্ডি সৈকতে ভয়াবহ হামলার দুই সপ্তাহ পেরোতেই অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে ক্ষোভ ও বিভক্তির ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হনুক্কা উদ্যাপনে অংশ নেওয়া মানুষের ওপর হামলায় প্রাণ হারান ১৫ জন। এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর শোকের পাশাপাশি শুরু হয়েছে দোষারোপের তীব্র লড়াই, যার কেন্দ্রে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ।
ঘটনার পর থেকেই বিরোধী লিবারেল–ন্যাশনাল জোটের অভিযোগ, ইহুদি বিদ্বেষ ঠেকাতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তাদের দাবি, গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ায় যে ঘৃণার রাজনীতি বাড়ছিল, তা মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান ছিল দুর্বল। বিদেশ থেকেও সমালোচনা এসেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে বলেন, ইহুদি বিদ্বেষ রুখতে আলবানিজ সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর পাল্টা ব্যাখ্যা
সমালোচনার জবাবে আলবানিজ মনে করিয়ে দেন, তাঁর সরকার দেশটির ইতিহাসে প্রথমবার ইহুদি বিদ্বেষ মোকাবিলায় বিশেষ দূত নিয়োগ করেছে। ঘৃণা ভাষা সংক্রান্ত আইন কড়া করা হয়েছে, সিনাগগসহ ইহুদি উপাসনালয়ের নিরাপত্তায় বাড়তি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবু অনেক অস্ট্রেলিয়ানের কাছে এসব উদ্যোগ অপর্যাপ্ত বলে মনে হচ্ছে। বড়দিনের আগে বন্ডিতে নিহতদের স্মরণসভায় উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জনতার দুয়োধ্বনি শুনতে হয়।
অস্ত্রনীতি ও নিরাপত্তা সংস্কারের বিতর্ক
চাপের মুখে সরকার অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বড় সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে। এটি ১৯৯৬ সালের তাসমানিয়ার গণহত্যার পর সবচেয়ে বড় অস্ত্র ফেরত কর্মসূচি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড অভিযোগ তুলেছেন, ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় ব্যর্থতা ঢাকতেই সরকার অস্ত্রনীতি নিয়ে কঠোর কথা বলছে। তা সত্ত্বেও জনমত জরিপ বলছে, ডান ও বাম উভয় শিবিরেই কড়া অস্ত্র আইন সমর্থন পাচ্ছে।

একই সঙ্গে ফেডারেল পুলিশ ও অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার কার্যক্রম পর্যালোচনার ঘোষণা এসেছে। হামলাকারীদের একজন আগে নিরাপত্তা সংস্থার নজরে এসেছিলেন, তবু তাঁর পরিবারের হাতে একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হামলার আগে তাদের বিদেশ সফর নিয়ে গোয়েন্দা ব্যর্থতার আলোচনা চলছে।
ঘৃণা ভাষা আইন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা
ইহুদি বিদ্বেষ নির্মূলের পথে সরকার আরও কঠোর ঘৃণাভাষা আইন প্রণয়নের কথা বলছে। বিশেষ দূতের প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে সেই প্রতিবেদনে ইহুদি বিদ্বেষের সংজ্ঞা ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন বন্ধের প্রস্তাব ঘিরে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে ইসরায়েল নিয়ে সমালোচনা দমন হতে পারে।

রাজ্য পর্যায়ে দ্রুত পদক্ষেপ
নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য সরকার ফেডারেল সরকারের চেয়ে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নিচ্ছে। সন্ত্রাসী হামলার পর তিন মাস পর্যন্ত জনসমাবেশ সীমিত করার ক্ষমতা পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। ফিলিস্তিন পন্থী সমাবেশ গুলো বিশেষভাবে প্রভাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা উঠেছে। পাশাপাশি নতুন বছরে কিছু স্লোগানকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এই সংকটকালে রাজ্যের নেতা ক্রিস মিন্স প্রশংসা পেলেও, নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। মানবাধিকার কর্মী ও আইনবিদদের সতর্কবার্তা, অতিরিক্ত কঠোরতা নিরাপত্তা বাড়ায় না, বরং সমাজকে আরও বিভক্ত করে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















