মঞ্চের আলো নিভে আসার আগেই দর্শকদের শ্বাস আটকে যায়। চোখ বন্ধ করে বসে থাকা একজন মানুষ নিজের অজান্তেই ভাবছেন কোথায় ভ্রমণে যেতে চান, আর ঠিক সেই মুহূর্তে মঞ্চে দাঁড়ানো মানসিক কৌশলবিদ বলে দিচ্ছেন সেই গন্তব্যের নাম। বিস্ময়, নীরবতা আর হাততালির ভেতর দিয়ে এমনই এক অভিজ্ঞতা তৈরি করেন ওজ পার্লম্যান, যিনি আজ বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত মানসিক কৌশল বিদদের একজন।
গল্প দিয়ে দর্শকের মন পড়া
ওজ পার্লম্যান নিজেকে কখনোই জাদুকর বা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে দাবি করেন না। তাঁর কথায়, তিনি মন পড়েন না, মানুষ পড়েন। মঞ্চে তাঁর কৌশল যতটা বিস্ময়কর, তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী তাঁর গল্প বলার ক্ষমতা। প্রতিটি পরিবেশনা তিনি এমনভাবে সাজান, যাতে দর্শক শুধু একটি কৌশল নয়, একটি গল্প নিয়ে বাড়ি ফেরেন। তাঁর লক্ষ্য কাউকে বোকা বানানো নয়, বরং এমন স্মৃতি তৈরি করা যা মানুষ অন্যদের কাছে গিয়ে বলবে।

পেছন থেকে শুরু হওয়া পরিকল্পনা
পার্লম্যানের কাজের ধরন একটু আলাদা। তিনি আগে ঠিক করেন দর্শক কী গল্প মনে রাখবে, তারপর সেখান থেকে উল্টো পথে হাঁটেন। ধৈর্য আর দীর্ঘ পরিকল্পনাই তাঁর সাফল্যের মূল। এজন্যই কোনো কোনো কৌশল বাস্তবায়নে তাঁর সময় লাগে বছরখানেক। আমেরিকান ফুটবল তারকা জো বারোর সামনে করা একটি কৌশলের পেছনে ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি, যা শেষ পর্যন্ত দর্শকদের বিস্ময়ে ভরিয়ে দেয়।
ব্যর্থতা থেকে শেখা আত্মবিশ্বাস
এই মানসিক শক্তির বীজ রোপিত হয়েছিল খুব অল্প বয়সে। কিশোর বয়সে একটি রেস্তোরাঁয় টেবিল ঘুরে ঘুরে কৌশল দেখানোর সময় অনেকবারই প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। তখনই তিনি বুঝেছিলেন, না মানে কখনোই শেষ নয়, বরং এখনো সময় আসেনি। এই মানসিকতা তাঁকে শিখিয়েছে মানুষ হিসেবে আঘাত আর পেশাদার হিসেবে অভিজ্ঞতাকে আলাদা করে দেখতে।

মন পড়া নয়, অভ্যাস গড়ার শিক্ষা
সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর বইয়ে তিনি কৌশলের কথা বলেননি, বলেছেন জীবনের কথা। কীভাবে মানুষকে বোঝা যায়, কীভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, আর কীভাবে লক্ষ্য থেকে সরে না গিয়ে এগিয়ে থাকা যায়, সেসব অভ্যাসের কথা তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর মতে, সবকিছুই ব্যাখ্যাযোগ্য এবং চর্চার মাধ্যমে শেখা সম্ভব।
নতুন বছরের সংকল্পে টিকে থাকার কৌশল
নতুন বছরের সংকল্প ভেঙে যাওয়ার পেছনে মূল সমস্যা ইচ্ছাশক্তির অভাব নয়, বরং আবেগের চাপ। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে পার্লম্যান বলেন, হঠাৎ ইচ্ছে হলে নিজেকে পুরোপুরি না বলার বদলে একটু সময় দিতে হয়। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করা, পানি পান করা বা অন্য কিছুতে মন দেওয়াই অনেক সময় সংকল্প ভাঙা থেকে বাঁচায়। নিজের মনের ভেতরের কারণটা খুঁজে বের করাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

গল্পই সবচেয়ে বড় যোগাযোগের হাতিয়ার
পার্লম্যানের বিশ্বাস, গল্প মানুষকে শুধু আনন্দ দেয় না, বরং ভাবনার ওপর প্রভাবও ফেলে। ইতিহাস, সংস্কৃতি আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গল্প বলাই মানুষের প্রাচীনতম শক্তি। দর্শক বা পাঠক যখন গল্পে ডুবে যায়, তখনই তৈরি হয় সেই জাদু, যেখানে একজন মানুষ অন্যের মন ছুঁয়ে ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















