১০:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬
মধ্যবিত্তের গড় ব্যয় আয়ের চেয়ে বেশি: মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৈষম্যের চাপ ২০২৬ ক্যাপিটল হিলে মাত্র চতুর্থ দিন: জানুয়ারি ৬-এর ভেতরের গল্প নতুন করে মনে করাল ‘দ্য আটলান্টিক’ লস অ্যাঞ্জেলেসের ভয়াবহ দাবানলের এক বছর: সংখ্যাগুলোই বলে দেয় কীভাবে মুহূর্তে বিপর্যয় নেমেছিল বাস্তবতা ধাক্কা দিল বহুল প্রতীক্ষিত চীনা এআই স্মার্টফোনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ঢাকা (পর্ব-৮৪) সিইএসে শকজের ‘ওপেনফিট প্রো’: ওপেন-ইয়ার ইয়ারবাড এখন আরও প্রিমিয়াম ফিলিপাইনে সাবেক জেনারেলের গ্রেপ্তারকে আইনের শাসনের উদাহরণ বলল সেনাবাহিনী ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান নিন্দা করল মেক্সিকো, ‘পরের টার্গেট’ হওয়া এড়াতে সতর্ক শেইনবাউম প্রাচীন ভারতে গণিতচর্চা (পর্ব-৩৫১) সাত বিষয়ে ফেল করায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে তালা দিল বিএনপি নেতার ছেলে

বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতার থানায় হুমকির পরে গ্রেফতার ও মুক্তি, আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন

  • Sarakhon Report
  • ০৬:৫২:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • 21

শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে প্রকাশ্যেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতা মাহদী হাসান ওসি আবুল কালামকে হুমকি দিচ্ছেন এই বলে যে, তারা বানিয়াচং থানা পুড়িয়েছেন এবং এস আই সন্তোষ চৌধুরীকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন।

বানিয়াচং থানা ও এস আই সন্তোষ চৌধুরীকে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা সম্পর্কে হবিগঞ্জের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মাহদী হাসানের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার মুখে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তবে সেই গ্রেফতারের প্রতিবাদে তার সমর্থকদের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে তাকে মুক্তি দেওয়া হলে তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা সমালোচনা।

যদিও মাহদী হাসানকে আদালত জামিন দিয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীদের অনেকে পুরো ঘটনার বিশ্লেষণে আইনের শাসনের প্রশ্ন তুলেছেন।

মাহদী হাসান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক।

গতকাল শনিবার তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপরই ঢাকা ও হবিগঞ্জে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্যরা। পরে রোববার সকালে আদালতে হাজির করা হলে তার আবেদনের প্রেক্ষিতে জামিন দেয় হবিগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

গত দোসরা জানুয়ারি মি. হাসানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

সেই ভিডিওতে দেখা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে প্রকাশ্যেই মি. হাসান ওসি আবুল কালামকে হুমকি দিচ্ছেন এই বলে যে, তারা বানিয়াচং থানা পুড়িয়েছেন এবং এস আই সন্তোষ চৌধুরীকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন।

ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষের ব্যাপক সমালোচনার মুখে শনিবার বিকেলে মাহদী হাসানকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

ওইদিন সন্ধ্যা থেকে তার মুক্তির দাবিতে দাবিতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা থানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। ঢাকাতেও কেন্দ্রীয়ভাবে বিক্ষোভ সমাবেশ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তাকে মুক্তি দিতে আলটিমেটামও দিয়েছিল সংগঠনটি থেকে।

রোববার এই সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে, শুধুমাত্র জামিন নয়, মাহদীকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। সেই সাথে জুলাই অংশগ্রহণকারী সবাইকে পহেলা জুলাই থেকে ৮ই অগাস্ট পর্যন্ত সব কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করতে হবে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, থানায় বসে প্রকাশ্যে ওসিকে হুমকি এবং মানুষ পুড়িয়ে মারার দাবি করার পরও কেন ওইদিনই মি. হাসানকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ? শেষপর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করা হলেও প্রতিবাদ কতটা যুক্তিসঙ্গত?

এছাড়া বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে তার মুক্তি বাংলাদেশে আইনের শাসনের দুর্বলতা কি না, এমন প্রশ্ন আলোচনায় এসেছে।

বানিয়াচং থানায় নিহত এস আই সন্তোষ চৌধুরী পুলিশের গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

পাঁচই অগাস্টের অভ্যুত্থানের দিনে বানিয়াচং থানা থেকে গভীর রাতে এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে বাছাই করে ছিনিয়ে নিয়ে থানা চত্তরেই পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

ভিডিওতে কী বলেছেন মাহদী হাসান?

গত বছরের অভ্যুত্থানের সময় মাহদী হাসান বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের হবিগঞ্জের প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন বলে দাবি করতে দেখা যায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে।

বেশ কয়েকজন কর্মীকেও তার সাথে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় দেখা যায়। থানার টেবিলের একপাশে ওসি আবুল কালাম অন্যপ্রান্তে মাহদী হাসান বসে আছেন।

পুরো ভিডিওতে মি. হাসানকে বেশ উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখা যায়।

টেবিল চাপড়ে তিনি বলেন, ” আমি স্ট্রিক্টলি এখানে এসছি। আমাকে বলতে হবে (এ সময় চিৎকার করেন) আমার ভাইকে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে? কেন বার্গেনিং করা হলো? “

নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের একজন নেতাকে পুলিশ আটক করার পর তাকে মুক্ত করতে তিনি ওই থানায় গিয়েছিলেন। ওই নেতাকে শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি কেন ডেভিল আখ্যা দিয়েছেন এবং কেন তাকে ছেড়ে না দিয়ে আদালতে হাজির করতে চেয়েছেন, এমন ব্যাখ্যা চাইতে দেখা যায় মি. হাসানকে।

২০২৩ সালের ছাত্রলীগের কমিটির নেতা হওয়ায় ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে এ সময় উল্লেখ করেন শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি।

কিন্তু মি. হাসান দাবি করেন, ওই ব্যক্তি আগে ছাত্রলীগ করলেও গতবছর জুলাইয়ে তাদের সাথেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করেছেন, এমন প্রমাণ সংবলিত ছবি ও ভিডিও পুলিশের কাছে পাঠানো হয়েছে।

ওসি সেসব দেখেছেন কিনা- এমন প্রশ্ন করেন মি. হাসান।

ওইসব ছবি, ভিডিও দেখার পরও কেন ওসি তাকে না ছেড়ে আদালতে চালান দেওয়ার কথা বলেছেন পুলিশের কাছে সেই কৈফিয়ত দাবি করেন তিনি।

ভিডিওতে দেখা যায়, মাহদী হাসান বলছেন, ” আমরা জুলাই অভ্যুত্থানের গভমেন্ট কেন ফর্ম করেছি, আমরাই গভর্নমেন্টটাকে ফর্ম করেছি। ওই জায়গা থেকে আপনি আমাদের প্রশাসনের লোক।”

তার সংগঠনের কর্মীদের কেন গ্রেফতার করা হলো- এমন প্রশ্নও পুলিশের কাছে করেন মি. হাসান।

হবিগঞ্জে ১৭ জন নিহত হয়েছে উল্লেখ করে একপর্যায়ে মি. হাসান বলেন, ” বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম। ওই জায়গা থেকে উনি (ওসি) কোন সাহসে এই কথাটা বললো (আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে) আমি জানতে চাই আজকে। আমি স্ট্রিকলি এখানে আসছি।”

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসান বাক-বিতণ্ডার একপর্যায়ে প্রশ্ন তোলেন, ছাত্রলীগ যারা করেছে আন্দোলন করলেও তাদের ধরে নিয়ে আসতে হবে?

পরে ওসি মি. কালাম তাদের জানান, তিনি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় নতুন জয়েন করেছেন।

“আমি ডান চিনি না, বাম চিনি না। আমাদেরকে ধরার জন্য যেটা বলা হয় যে, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের যাদেরকে ধরার জন্য বলা হয়, তাদেরকে কমিটি দেখে ধরা হয় ” বলেন মি. কালাম।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মাহদী হাসান জানান, ছাত্রলীগের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাদের তিন জন কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

আবু ফজল নামে একজন এখনো কারাগারে রয়েছেন বলে জানান তিনি।

আদালতে কালো চাদর পড়া মাহদী হাসান। তার দুই পাশে পুলিশ সদস্যরা।

মাহদী হাসানের জামিন পাওয়ার পর আদালত প্রাঙ্গন থেকেই আনন্দ মিছিল বের করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা – কর্মীরা।

রাতভর বিক্ষোভ, মুক্তির পর আনন্দ মিছিল

ওই ঘটনায় পুলিশের সরকারি কাজে বাধা দান ও হুমকির অভিযোগে চার ধারায় মি. হাসানের বিরুদ্ধে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় মামলা করেছে পুলিশ।

পরে শনিবার বিকেলে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শতাধিক নেতা-কর্মী সদর থানার সামনে সন্ধ্যা থেকে অবস্থান নেয়।

তাদের দাবি, রাতেই আদালত বসিয়ে মাহদী হাসানের জামিন শুনানি করতে হবে। পরে রোববার সকালে মি. হাসানকে আদালতে হাজির করে পুলিশ।

শুনানি শেষে তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করে হবিগঞ্জের বিচারিক আদালত।

জামিনের আদেশের কিছুক্ষণের মধ্যেই মাহদী হাসান মুক্ত হয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের নিয়ে আনন্দ মিছিল বের করে হবিগঞ্জ শহর প্রদক্ষিণ করেন।

বানিয়াচং থানা পোড়ানো ও এসআই সন্তোষকে জ্বালিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জামিনের পরে মি. হাসানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি দাবি করেন, মুখ ফস্কে অসাবধানতাবশত এ কথা বলেছেন।

“সেদিন যে কথাটা আমি বলেছি এটা একদম অসাবধানতাবশত স্লিপ অব টাং হয়েছে ” বলেন মি. হাসান।

পাঁচই অগাস্টের গণ-অভ্যুত্থানের দিনে বানিয়াচংয়ে পুলিশের গুলিতে অন্তত আটজন নিহত হন।

ওইদিন পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর পর হাজার হাজার গ্রামবাসী থানা ঘেরাও করে সেখানে থাকা সব পুলিশকে হত্যার হুমকি দেয়।

বিক্ষুব্ধ লোকজন বানিয়াচং থানায় আক্রমণ চালিয়ে অস্ত্র লুট ও অগ্নিসংযোগ করে এবং অর্ধশতাধিক পুলিশকে অবরুদ্ধ করে।

সেদিন দিনভর আলাপ আলোচনার পর গভীর রাতে পুলিশ সদস্যদের থানার ভেতর থেকে উদ্ধারের সময় এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে বাছাই করে ছিনিয়ে নিয়ে থানা চত্তরেই পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

পরদিন ছয়ই অগাস্ট তার মরদেহ থানার সামনে একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

বৈষম্যবিরোধী নেতা মি. হাসান সেদিন বানিয়াচং থানার সামনে ছিলেন না দাবি করে জানান, হবিগঞ্জ শহরের টাউন হলের সামনে বিজয় মিছিলে ছিলেন সেদিন।

বানিয়াচং থানা

আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, এ ধরনের কথাবার্তা বলে পুলিশকে হেয় বা দুর্বল প্রমাণিত করার চেষ্টা করলে তা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মোটেও সহায়ক না।

‘পুলিশকে হেয় করার চেষ্টা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সহায়ক না’

মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক মনে করেন, এ ধরনের কথাবার্তার মাধ্যমে পুলিশকে হেয় করা কাম্য নয়।

“এ ধরনের কথাবার্তা বলে পুলিশকে হেয় বা দুর্বল প্রমাণিত করার চেষ্টা করলে তা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মোটেও সহায়ক না” বলেন মি. মালিক।

তবে তিনি এটিও জানান, সুনির্দিষ্ট কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকলে কেবলমাত্র কথার ভিত্তিতে কাউকে আটক করা যায় না।

যদি কোনো ব্যক্তি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তাহলেই তা আমলে নিয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে বলে জানান আইনজীবী মি. মালিক।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মি. হাসান পুলিশের সাথে কথোপকথনের একপর্যায়ে এ কথা বলেছেন।

তাই এটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি হিসেবে গণ্য হবে না বলে মনে করেন তিনি।

“এটা আইনের চোখে অতটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মোটেও সহায়ক নয়,” বলেন আইনজীবী শাহদীন মালিক।

রাতভর হবিগঞ্জ সদর থানার সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের অবস্থান ও বিক্ষোভ।

এই ঘটনা কেবলমাত্র একটি ঘটনাই নয় বরং ঘটনাটির অন্তর্নিহিত প্রভাব অনেক ব্যাপক বলে মনে করেন তৌহিদুল হক।

‘মুক্তির জন্য বিক্ষোভ প্রমাণ করে আইনের শাসন দুর্বল’

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈষম্যবিরোধী নেতা মাহদী হাসানের ‘স্বীকারোক্তি’ ও গ্রেফতারের পরে মুক্তির দাবিতে শনিবার সন্ধ্যা থেকে রাতভর তার নেতা-কর্মীদের থানার সামনে বিক্ষোভের ঘটনা প্রমাণ করে দেশে আইনের শাসন একেবারেই দুর্বল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এ ধরনের পরিস্থিতি বা বাস্তবতার কাছে যদি আইনের শাসন সবসময় পদাবনত বা অবনত থাকে বা এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা বা আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা থাকবে না”।

এই ঘটনা কেবলমাত্র একটি ঘটনাই নয় বরং ঘটনাটির অন্তর্নিহিত প্রভাব অনেক ব্যাপক বলে মনে করেন মি. হক।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য মানতে না চাওয়ার কারণেই ক্ষমতার বলয়ে থাকা ব্যক্তিরা যা খুশি তাই করতে চায়। ফলে দেশে আইনের শাসন নেই বলেই ধারণা হয় সাধারণ মানুষের।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, ” আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলছি কিন্তু আইনি সংস্কৃতি তৈরি করা বা আইন মান্যকারী পরিবেশ বা জনগোষ্ঠী তৈরি করা এই বৈশিষ্ট্যগুলো আসলে আমরা মানতে চাচ্ছি না।”

মি. হক মনে করেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মি. হাসান ঘরোয়া কোনো পরিবেশে পুলিশকে পুড়িয়ে মারার কথা বলেননি, বরং যে পরিবেশে বলেছেন, তা ১৬৪ ধারার চেয়ে কোনো অংশে কম না।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন সময় দলটির অঙ্গসংগঠনগুলোর এ ধরনের প্রভাব খাটানোর নজির দেখা গেছে।

পাঁচই অগাস্টের পরে বিভিন্ন জায়গাতে সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে মবোক্রেসির মতো নানা ধরনের অপরাধ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ” এখন সেই জায়গাতে এসে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা বা নিজেদের অনুকূলে সিদ্ধান্ত না দিলে মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টি করে নিজের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়ে আসার যে অগণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা, যারা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ যখন এ ধরনের মন্তব্য করেন তখন এ ব্যাপারগুলো নিয়ে মানুষের মধ্যে নানারকম প্রশ্ন যেমন তৈরি হয়, তখন এটাও তৈরি হয় যে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে কি না? “

রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রভাব খাটানোর মতো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বারবার ঘটছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক মি. হক।

এ বিষয়ে কথা হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার, শায়েস্তাগঞ্জ থানা ও বানিয়াচং থানার ওসিসহ অন্তত চারজনকে ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি তারা।

পরে পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া অ্যান্ড পিআর উইংয়ের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইনের মোবাইলে ফোন করলেও রেসপন্স করেননি তিনি।

বিবিসি নিউজ বাংলা

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যবিত্তের গড় ব্যয় আয়ের চেয়ে বেশি: মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৈষম্যের চাপ ২০২৬

বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতার থানায় হুমকির পরে গ্রেফতার ও মুক্তি, আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন

০৬:৫২:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬

বানিয়াচং থানা ও এস আই সন্তোষ চৌধুরীকে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা সম্পর্কে হবিগঞ্জের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মাহদী হাসানের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার মুখে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তবে সেই গ্রেফতারের প্রতিবাদে তার সমর্থকদের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে তাকে মুক্তি দেওয়া হলে তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা সমালোচনা।

যদিও মাহদী হাসানকে আদালত জামিন দিয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীদের অনেকে পুরো ঘটনার বিশ্লেষণে আইনের শাসনের প্রশ্ন তুলেছেন।

মাহদী হাসান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক।

গতকাল শনিবার তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপরই ঢাকা ও হবিগঞ্জে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্যরা। পরে রোববার সকালে আদালতে হাজির করা হলে তার আবেদনের প্রেক্ষিতে জামিন দেয় হবিগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

গত দোসরা জানুয়ারি মি. হাসানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

সেই ভিডিওতে দেখা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে প্রকাশ্যেই মি. হাসান ওসি আবুল কালামকে হুমকি দিচ্ছেন এই বলে যে, তারা বানিয়াচং থানা পুড়িয়েছেন এবং এস আই সন্তোষ চৌধুরীকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন।

ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষের ব্যাপক সমালোচনার মুখে শনিবার বিকেলে মাহদী হাসানকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

ওইদিন সন্ধ্যা থেকে তার মুক্তির দাবিতে দাবিতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা থানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। ঢাকাতেও কেন্দ্রীয়ভাবে বিক্ষোভ সমাবেশ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তাকে মুক্তি দিতে আলটিমেটামও দিয়েছিল সংগঠনটি থেকে।

রোববার এই সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে, শুধুমাত্র জামিন নয়, মাহদীকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। সেই সাথে জুলাই অংশগ্রহণকারী সবাইকে পহেলা জুলাই থেকে ৮ই অগাস্ট পর্যন্ত সব কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করতে হবে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, থানায় বসে প্রকাশ্যে ওসিকে হুমকি এবং মানুষ পুড়িয়ে মারার দাবি করার পরও কেন ওইদিনই মি. হাসানকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ? শেষপর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করা হলেও প্রতিবাদ কতটা যুক্তিসঙ্গত?

এছাড়া বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে তার মুক্তি বাংলাদেশে আইনের শাসনের দুর্বলতা কি না, এমন প্রশ্ন আলোচনায় এসেছে।

বানিয়াচং থানায় নিহত এস আই সন্তোষ চৌধুরী পুলিশের গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

পাঁচই অগাস্টের অভ্যুত্থানের দিনে বানিয়াচং থানা থেকে গভীর রাতে এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে বাছাই করে ছিনিয়ে নিয়ে থানা চত্তরেই পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

ভিডিওতে কী বলেছেন মাহদী হাসান?

গত বছরের অভ্যুত্থানের সময় মাহদী হাসান বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের হবিগঞ্জের প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন বলে দাবি করতে দেখা যায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে।

বেশ কয়েকজন কর্মীকেও তার সাথে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় দেখা যায়। থানার টেবিলের একপাশে ওসি আবুল কালাম অন্যপ্রান্তে মাহদী হাসান বসে আছেন।

পুরো ভিডিওতে মি. হাসানকে বেশ উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখা যায়।

টেবিল চাপড়ে তিনি বলেন, ” আমি স্ট্রিক্টলি এখানে এসছি। আমাকে বলতে হবে (এ সময় চিৎকার করেন) আমার ভাইকে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে? কেন বার্গেনিং করা হলো? “

নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের একজন নেতাকে পুলিশ আটক করার পর তাকে মুক্ত করতে তিনি ওই থানায় গিয়েছিলেন। ওই নেতাকে শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি কেন ডেভিল আখ্যা দিয়েছেন এবং কেন তাকে ছেড়ে না দিয়ে আদালতে হাজির করতে চেয়েছেন, এমন ব্যাখ্যা চাইতে দেখা যায় মি. হাসানকে।

২০২৩ সালের ছাত্রলীগের কমিটির নেতা হওয়ায় ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে এ সময় উল্লেখ করেন শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি।

কিন্তু মি. হাসান দাবি করেন, ওই ব্যক্তি আগে ছাত্রলীগ করলেও গতবছর জুলাইয়ে তাদের সাথেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করেছেন, এমন প্রমাণ সংবলিত ছবি ও ভিডিও পুলিশের কাছে পাঠানো হয়েছে।

ওসি সেসব দেখেছেন কিনা- এমন প্রশ্ন করেন মি. হাসান।

ওইসব ছবি, ভিডিও দেখার পরও কেন ওসি তাকে না ছেড়ে আদালতে চালান দেওয়ার কথা বলেছেন পুলিশের কাছে সেই কৈফিয়ত দাবি করেন তিনি।

ভিডিওতে দেখা যায়, মাহদী হাসান বলছেন, ” আমরা জুলাই অভ্যুত্থানের গভমেন্ট কেন ফর্ম করেছি, আমরাই গভর্নমেন্টটাকে ফর্ম করেছি। ওই জায়গা থেকে আপনি আমাদের প্রশাসনের লোক।”

তার সংগঠনের কর্মীদের কেন গ্রেফতার করা হলো- এমন প্রশ্নও পুলিশের কাছে করেন মি. হাসান।

হবিগঞ্জে ১৭ জন নিহত হয়েছে উল্লেখ করে একপর্যায়ে মি. হাসান বলেন, ” বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম। ওই জায়গা থেকে উনি (ওসি) কোন সাহসে এই কথাটা বললো (আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে) আমি জানতে চাই আজকে। আমি স্ট্রিকলি এখানে আসছি।”

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসান বাক-বিতণ্ডার একপর্যায়ে প্রশ্ন তোলেন, ছাত্রলীগ যারা করেছে আন্দোলন করলেও তাদের ধরে নিয়ে আসতে হবে?

পরে ওসি মি. কালাম তাদের জানান, তিনি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় নতুন জয়েন করেছেন।

“আমি ডান চিনি না, বাম চিনি না। আমাদেরকে ধরার জন্য যেটা বলা হয় যে, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের যাদেরকে ধরার জন্য বলা হয়, তাদেরকে কমিটি দেখে ধরা হয় ” বলেন মি. কালাম।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মাহদী হাসান জানান, ছাত্রলীগের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাদের তিন জন কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

আবু ফজল নামে একজন এখনো কারাগারে রয়েছেন বলে জানান তিনি।

আদালতে কালো চাদর পড়া মাহদী হাসান। তার দুই পাশে পুলিশ সদস্যরা।

মাহদী হাসানের জামিন পাওয়ার পর আদালত প্রাঙ্গন থেকেই আনন্দ মিছিল বের করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা – কর্মীরা।

রাতভর বিক্ষোভ, মুক্তির পর আনন্দ মিছিল

ওই ঘটনায় পুলিশের সরকারি কাজে বাধা দান ও হুমকির অভিযোগে চার ধারায় মি. হাসানের বিরুদ্ধে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় মামলা করেছে পুলিশ।

পরে শনিবার বিকেলে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শতাধিক নেতা-কর্মী সদর থানার সামনে সন্ধ্যা থেকে অবস্থান নেয়।

তাদের দাবি, রাতেই আদালত বসিয়ে মাহদী হাসানের জামিন শুনানি করতে হবে। পরে রোববার সকালে মি. হাসানকে আদালতে হাজির করে পুলিশ।

শুনানি শেষে তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করে হবিগঞ্জের বিচারিক আদালত।

জামিনের আদেশের কিছুক্ষণের মধ্যেই মাহদী হাসান মুক্ত হয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের নিয়ে আনন্দ মিছিল বের করে হবিগঞ্জ শহর প্রদক্ষিণ করেন।

বানিয়াচং থানা পোড়ানো ও এসআই সন্তোষকে জ্বালিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জামিনের পরে মি. হাসানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি দাবি করেন, মুখ ফস্কে অসাবধানতাবশত এ কথা বলেছেন।

“সেদিন যে কথাটা আমি বলেছি এটা একদম অসাবধানতাবশত স্লিপ অব টাং হয়েছে ” বলেন মি. হাসান।

পাঁচই অগাস্টের গণ-অভ্যুত্থানের দিনে বানিয়াচংয়ে পুলিশের গুলিতে অন্তত আটজন নিহত হন।

ওইদিন পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর পর হাজার হাজার গ্রামবাসী থানা ঘেরাও করে সেখানে থাকা সব পুলিশকে হত্যার হুমকি দেয়।

বিক্ষুব্ধ লোকজন বানিয়াচং থানায় আক্রমণ চালিয়ে অস্ত্র লুট ও অগ্নিসংযোগ করে এবং অর্ধশতাধিক পুলিশকে অবরুদ্ধ করে।

সেদিন দিনভর আলাপ আলোচনার পর গভীর রাতে পুলিশ সদস্যদের থানার ভেতর থেকে উদ্ধারের সময় এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে বাছাই করে ছিনিয়ে নিয়ে থানা চত্তরেই পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

পরদিন ছয়ই অগাস্ট তার মরদেহ থানার সামনে একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

বৈষম্যবিরোধী নেতা মি. হাসান সেদিন বানিয়াচং থানার সামনে ছিলেন না দাবি করে জানান, হবিগঞ্জ শহরের টাউন হলের সামনে বিজয় মিছিলে ছিলেন সেদিন।

বানিয়াচং থানা

আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, এ ধরনের কথাবার্তা বলে পুলিশকে হেয় বা দুর্বল প্রমাণিত করার চেষ্টা করলে তা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মোটেও সহায়ক না।

‘পুলিশকে হেয় করার চেষ্টা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সহায়ক না’

মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক মনে করেন, এ ধরনের কথাবার্তার মাধ্যমে পুলিশকে হেয় করা কাম্য নয়।

“এ ধরনের কথাবার্তা বলে পুলিশকে হেয় বা দুর্বল প্রমাণিত করার চেষ্টা করলে তা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মোটেও সহায়ক না” বলেন মি. মালিক।

তবে তিনি এটিও জানান, সুনির্দিষ্ট কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকলে কেবলমাত্র কথার ভিত্তিতে কাউকে আটক করা যায় না।

যদি কোনো ব্যক্তি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তাহলেই তা আমলে নিয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে বলে জানান আইনজীবী মি. মালিক।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মি. হাসান পুলিশের সাথে কথোপকথনের একপর্যায়ে এ কথা বলেছেন।

তাই এটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি হিসেবে গণ্য হবে না বলে মনে করেন তিনি।

“এটা আইনের চোখে অতটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মোটেও সহায়ক নয়,” বলেন আইনজীবী শাহদীন মালিক।

রাতভর হবিগঞ্জ সদর থানার সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের অবস্থান ও বিক্ষোভ।

এই ঘটনা কেবলমাত্র একটি ঘটনাই নয় বরং ঘটনাটির অন্তর্নিহিত প্রভাব অনেক ব্যাপক বলে মনে করেন তৌহিদুল হক।

‘মুক্তির জন্য বিক্ষোভ প্রমাণ করে আইনের শাসন দুর্বল’

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈষম্যবিরোধী নেতা মাহদী হাসানের ‘স্বীকারোক্তি’ ও গ্রেফতারের পরে মুক্তির দাবিতে শনিবার সন্ধ্যা থেকে রাতভর তার নেতা-কর্মীদের থানার সামনে বিক্ষোভের ঘটনা প্রমাণ করে দেশে আইনের শাসন একেবারেই দুর্বল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এ ধরনের পরিস্থিতি বা বাস্তবতার কাছে যদি আইনের শাসন সবসময় পদাবনত বা অবনত থাকে বা এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা বা আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা থাকবে না”।

এই ঘটনা কেবলমাত্র একটি ঘটনাই নয় বরং ঘটনাটির অন্তর্নিহিত প্রভাব অনেক ব্যাপক বলে মনে করেন মি. হক।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য মানতে না চাওয়ার কারণেই ক্ষমতার বলয়ে থাকা ব্যক্তিরা যা খুশি তাই করতে চায়। ফলে দেশে আইনের শাসন নেই বলেই ধারণা হয় সাধারণ মানুষের।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, ” আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলছি কিন্তু আইনি সংস্কৃতি তৈরি করা বা আইন মান্যকারী পরিবেশ বা জনগোষ্ঠী তৈরি করা এই বৈশিষ্ট্যগুলো আসলে আমরা মানতে চাচ্ছি না।”

মি. হক মনে করেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মি. হাসান ঘরোয়া কোনো পরিবেশে পুলিশকে পুড়িয়ে মারার কথা বলেননি, বরং যে পরিবেশে বলেছেন, তা ১৬৪ ধারার চেয়ে কোনো অংশে কম না।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন সময় দলটির অঙ্গসংগঠনগুলোর এ ধরনের প্রভাব খাটানোর নজির দেখা গেছে।

পাঁচই অগাস্টের পরে বিভিন্ন জায়গাতে সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে মবোক্রেসির মতো নানা ধরনের অপরাধ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ” এখন সেই জায়গাতে এসে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা বা নিজেদের অনুকূলে সিদ্ধান্ত না দিলে মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টি করে নিজের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়ে আসার যে অগণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা, যারা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ যখন এ ধরনের মন্তব্য করেন তখন এ ব্যাপারগুলো নিয়ে মানুষের মধ্যে নানারকম প্রশ্ন যেমন তৈরি হয়, তখন এটাও তৈরি হয় যে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে কি না? “

রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রভাব খাটানোর মতো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বারবার ঘটছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক মি. হক।

এ বিষয়ে কথা হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার, শায়েস্তাগঞ্জ থানা ও বানিয়াচং থানার ওসিসহ অন্তত চারজনকে ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি তারা।

পরে পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া অ্যান্ড পিআর উইংয়ের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইনের মোবাইলে ফোন করলেও রেসপন্স করেননি তিনি।

বিবিসি নিউজ বাংলা