সুন্দরবনে শিকারিদের পাতা ফাঁদে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে উদ্ধার হওয়া একটি বাঘিনী এখনও গভীর মানসিক আঘাতে রয়েছে এবং শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় আছে বলে জানিয়েছেন পশুচিকিৎসকেরা। মঙ্গলবার এ তথ্য জানানো হয়।
গাজীপুর সাফারি পার্কে গঠিত চার সদস্যের বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ডের প্রধান, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবু হাদি নূর আলী খান বলেন, উদ্ধারকালে বাঘিনীর অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটজনক। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থায় সামান্য উন্নতি দেখা গেলেও এখনও তিনি খুবই নাজুক পর্যায়ে রয়েছেন।
তিনি জানান, বাঘিনী চরম দুর্বলতায় ভুগছে এবং মানসিকভাবে এখনো স্বাভাবিক হয়নি। অল্প অল্প করে মাংস খাওয়ানো হচ্ছে। মানুষ কাছে এলে সে আক্রমণাত্মক আচরণ করছে, যা তার মানসিক ট্রমার লক্ষণ।

চিকিৎসা ও শারীরিক জটিলতা
মেডিকেল বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বাঘিনীকে ভিটামিন সি, ব্যথানাশক ওষুধ, অ্যানালজেসিক, স্যালাইন, ইলেকট্রোলাইট এবং অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে। তবে কবে নাগাদ সে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আবার সুন্দরবনে ফিরতে পারবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেননি চিকিৎসকেরা।
ডা. খান বলেন, চিকিৎসক দল আশাবাদী হলেও পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হবে। পাশাপাশি তিনি সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে বাঘ ও হরিণ রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর জোর দেন। শিকারিদের প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সুন্দরবনের প্রতিটি রেঞ্জে অন্তত দুটি করে পশুচিকিৎসক নিয়োগ এবং আধুনিক বন্যপ্রাণী চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেন তিনি।
আঘাত ও ইলেকট্রোলাইটের সমস্যা
গাজীপুর সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ডা. জুলকার নাইন জানান, উদ্ধার হওয়ার পর থেকেই বাঘিনী গভীর ট্রমায় রয়েছে এবং তার জীবন এখনও ঝুঁকিপূর্ণ। তার পায়ের ক্ষতস্থানে পচন ধরার আশঙ্কা রয়েছে, কিছু কোষ নষ্ট হয়ে গেছে এবং ক্ষতের চারপাশের চামড়া আলাদা হয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত ক্ষত পরিষ্কার ও ড্রেসিং করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বাঘিনী সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও ফসফেটের ঘাটতিজনিত ইলেকট্রোলাইট সমস্যায় ভুগছে। অতিরিক্ত দুর্বলতার কারণে সে এখনো হাঁটতে পারছে না, যদিও সামগ্রিক শারীরিক অবস্থায় সামান্য উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
পর্যবেক্ষণ ও সরকারি উদ্যোগ
খুলনা বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল জানান, বাঘিনীকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মন্ত্রণালয় গঠিত চার সদস্যের বিশেষজ্ঞ বোর্ড ইতোমধ্যে তাকে পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ নির্ধারণ করেছে।
উদ্ধারের ঘটনা ও শিকারিদের তৎপরতা
শনিবার বিকেলে এক জেলে সুন্দরবনের ভেতরে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে প্রথম আহত বাঘিনীকে দেখতে পান। পরে বন বিভাগের কর্মীরা এলাকা ঘিরে রেখে রোববার দুপুরে তাকে অবচেতন করে খুলনা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যান।

এদিকে, সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের ঘাঘরামারি এলাকা থেকে বুধবার বিকেলে শিকারিদের ফাঁদে আটকে পড়া একটি চিত্রল হরিণ উদ্ধার করা হয়েছে। বন বিভাগ মঙ্গলবার ও বুধবার বনাঞ্চলে তল্লাশি চালিয়ে ১৯টি পরিত্যক্ত ফাঁদ উদ্ধার করলেও কাউকে আটক করা যায়নি।
বাঘের সংখ্যা বাড়লেও ঝুঁকি রয়ে গেছে
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বাঘের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫টি। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১১৪ এবং ২০১৫ সালে ছিল ১০৬।
সংখ্যা বাড়লেও সুন্দরবনের বাঘেরা এখনও শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ নানা হুমকির মুখে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















