বিশ্ববাজারে চাহিদা হ্রাস, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে টানা পাঁচ মাস ধরে কমছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এই খাতের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
টানা পতনে রপ্তানি আয়
রপ্তানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এর ফলে দেশের মোট রপ্তানি আয়ও হ্রাস পেয়েছে।

মাসভিত্তিক কমার চিত্র
আগস্ট মাসে পোশাক রপ্তানি কমে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশে। অক্টোবরে রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ, নভেম্বরে ৫ শতাংশ এবং ডিসেম্বর মাসে সবচেয়ে বেশি ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। এই ধারাবাহিক পতনের কারণে সামগ্রিকভাবে দেশের মোট রপ্তানি আয় কমেছে ২ দশমিক ১৯ শতাংশ।
রপ্তানি কমার প্রধান কারণ
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে বিদেশি ক্রেতারা পোশাকের অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও কার্যকর সরকার না থাকার বিষয়টি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতির প্রভাবে ভারত ও চীনের প্রস্তুতকারকেরা ইউরোপীয় বাজারে কম দামে পোশাক সরবরাহে মনোযোগ দিচ্ছে। এতে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি চাপে পড়েছে। সার্বিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা নতুন করে রপ্তানি আদেশ দিতেও দ্বিধা করছে।

ডিসেম্বরের রপ্তানি পরিস্থিতি
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ ৩২৩ কোটি ৪১ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই মাসে এ অঙ্ক ছিল ৩৭৭ কোটি ৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ।
এই সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং নিট পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। গত অর্থবছরের ডিসেম্বরে ওভেন পোশাক রপ্তানি ছিল ১৮৭ কোটি ডলার, যা চলতি অর্থবছরে নেমে এসেছে ১৬০ কোটি ডলারে। একই সময়ে নিট পোশাক রপ্তানি ১৮৯ কোটি ডলার থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৬৩ কোটি ডলারে।
ছয় মাসের সামগ্রিক চিত্র
চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ মোট ১৯ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে নিটওয়্যার পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১০ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ২২ শতাংশ কম। ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৮ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার, যা কমেছে ১ দশমিক ৯১ শতাংশ।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা ও প্রত্যাশা
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুল্ক আরোপ ও বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে অধিকাংশ বিদেশি ক্রেতা নতুন অর্ডার দিচ্ছে না। ফলে আগামী কয়েক মাসেও ব্যবসার এই ধীরগতি অব্যাহত থাকতে পারে। তবে নতুন শুল্ক কাঠামোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা মানিয়ে নিতে পারলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তারা আশা করছেন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, ক্রেতাদের নতুন অর্ডার না দেওয়াই রপ্তানি কমার অন্যতম প্রধান কারণ। প্রত্যাশিত হারে কাজের আদেশ না পাওয়ায় খাতটি চাপের মুখে পড়েছে।
বার্ষিক হিসাবে সামান্য ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি
যদিও চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানি কমেছে, তবু একক বছর হিসেবে ২০২৫ সালে পোশাক রপ্তানিতে সামান্য ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ মোট ৩ হাজার ৮৮২ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৩৪ কোটি ২৬ লাখ ডলার বা শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















