বরিশালের জনজীবনে যে নদীটি নিঃশব্দে কিন্তু গভীরভাবে মিশে আছে, তার নাম পাথরঘাটা নদী। এই নদী কেবল জলধারা নয়—এটি স্মৃতি, শ্রম, গান, উৎসব আর প্রতিদিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। বর্ষায় ফুলে-ফেঁপে ওঠা স্রোত যেমন মানুষের কষ্ট-স্বপ্ন বহন করে, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে শান্ত জলের আয়নায় প্রতিফলিত হয় গ্রামের মুখ, নৌকার ছায়া আর সময়ের ধীর পদচিহ্ন। পাথরঘাটা নদী বরিশালের হৃদয়ে এক জীবন্ত ইতিহাস—যার প্রতিটি ঢেউয়ে লেখা আছে মানুষের গল্প।
ভৌগোলিক পরিচয় ও প্রাকৃতিক প্রবাহ
পাথরঘাটা নদীর পথচলা বরিশালের বিস্তৃত নদীবহুল ভূপ্রকৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। শাখা-প্রশাখা আর খাল-নালার সঙ্গে এর যোগসূত্র নদীটিকে করেছে জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। বর্ষায় নদীর তীর ছাপিয়ে জল ঢুকে পড়ে আশপাশের মাঠে, জমিতে; আবার শীতে জল নেমে গেলে দেখা যায় চর, বালুকাবেলা আর নৌকার ভিড়। এই ওঠানামার মধ্যেই নদীটি শিখিয়েছে সহাবস্থান—মানুষ ও প্রকৃতির নীরব চুক্তি।
![]()
ইতিহাসের স্রোতে পাথরঘাটা
পাথরঘাটা নদী বরিশালের নৌপথের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। একসময় এই নদীই ছিল বাণিজ্য, যাতায়াত ও সামাজিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। নৌকায় করে চাল, পাট, মাছ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আসত-যেত। নদীপাড়ের হাট-বাজার ছিল প্রাণকেন্দ্র; সন্ধ্যায় কুপির আলোয় জমত গল্প। সময় বদলেছে, সড়ক এসেছে—তবু নদীর গুরুত্ব ফুরায়নি। ইতিহাসের স্তরে স্তরে আজও ভেসে ওঠে সেই নৌবাণিজ্যের স্মৃতি।
জীবিকা, মাছ আর নৌকার গল্প
নদীর সঙ্গে মিশে আছে জীবিকার প্রশ্ন। জেলেদের জাল ফেলা, মাঝিদের বৈঠার ছন্দ, নৌকার কাঠে লবণের দাগ—সবই নদীকেন্দ্রিক শ্রমের চিহ্ন। ভোরের কুয়াশায় জাল টানার দৃশ্য, দুপুরে নৌকায় ঘুম, সন্ধ্যায় ঘাটে নোঙর—এই চক্রেই চলে জীবন। নদীর মাছ শুধু খাদ্য নয়; এটি অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পর্কের সেতু।
গ্রামীণ জীবন ও নদীপাড়ের দৈনন্দিনতা
পাথরঘাটা নদীপাড়ের গ্রামীণ জীবন ধীর, কিন্তু গভীর। সকালের আলোয় নারীরা নদীর ঘাটে কাপড় ধোয়, শিশুরা সাঁতার শেখে, বয়স্করা বসে নদীর দিকে তাকিয়ে সময়ের হিসাব মেলায়। বর্ষায় জল বাড়লে দুশ্চিন্তা, শীতে জল নামলে স্বস্তি—এই ওঠানামার সঙ্গেই গড়ে উঠেছে মানসিকতা। নদী এখানে শিক্ষক—সহনশীলতা আর অভিযোজন শেখায়।
সাংস্কৃতিক জীবন ও উৎসব: নদীর গান, স্মৃতি আর উৎসবের ঢেউ
পাথরঘাটা নদীকে ঘিরে বরিশালের সাংস্কৃতিক জীবনের এক গভীর অধ্যায় রচিত হয়েছে। নদীপাড়ে জন্ম নিয়েছে ভাটিয়ালি আর পালাগানের সুর—যেখানে মাঝির কণ্ঠে ভেসে আসে প্রেম, বিরহ, নদীর ভয় আর ভরসা। বৈঠার তালে তালে গান উঠলে স্রোত যেন মুহূর্তে থেমে শোনে। গ্রামীণ আসরে নদীর গল্প বলা হয় উপকথার ভঙ্গিতে—কখনো জোয়ারে ভেসে যাওয়া ঘর, কখনো চর জেগে ওঠার আনন্দ।
উৎসবের দিনগুলোতে নদী হয়ে ওঠে মিলনমেলা। নৌকাবাইচ, ধর্মীয় উপলক্ষ, গ্রাম্য মেলা—সবখানেই নদী কেন্দ্রে। পূর্ণিমার রাতে নদীর বুকে ভাসমান প্রদীপের আলো, ঢাক-ঢোলের শব্দ আর মানুষের কোলাহল এক অনন্য আবহ তৈরি করে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম নদীর সঙ্গে জুড়ে রেখেছে স্মৃতির মালা—শৈশবের প্রথম সাঁতার, বর্ষার বৃষ্টি, কিংবা বিদায়ের নৌকা। এই সাংস্কৃতিক স্রোতই পাথরঘাটাকে কেবল ভূগোল নয়, অনুভূতির মানচিত্র বানিয়েছে।

পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ ও দায়
নদী যেমন দেয়, তেমনি আজ ঝুঁকিতেও আছে। দখল, দূষণ, অবৈধ বালু উত্তোলন আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে চাপ সৃষ্টি করছে। তীরভাঙন গ্রাস করছে ঘরবাড়ি; জীববৈচিত্র্য সংকুচিত হচ্ছে। তবু স্থানীয় উদ্যোগ, সচেতনতা আর টেকসই ব্যবস্থাপনার আশা আছে। নদী রক্ষা মানে কেবল জল রক্ষা নয়—মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষা।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও টেকসই পথচলা
পাথরঘাটা নদীকে কেন্দ্র করে ইকো-ট্যুরিজম, নৌভিত্তিক পরিবহন ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের সম্ভাবনা বিপুল। পরিকল্পিত উন্নয়ন হলে নদীর সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রেখেই জীবিকা বাড়ানো সম্ভব। প্রয়োজন সমন্বিত নীতি—যেখানে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা, পরিবেশের ভারসাম্য আর অর্থনৈতিক চাহিদা একসঙ্গে বিবেচিত হবে।
পাথরঘাটা নদী বরিশালের হৃদয়ে এক অনবরত স্রোত—যা ইতিহাস, জীবিকা, সংস্কৃতি আর স্মৃতিকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। এই নদীকে বাঁচানো মানে নিজের শিকড়কে বাঁচানো। যতদিন স্রোত থাকবে, ততদিন গল্প থাকবে—মানুষের, গ্রামের, আর বরিশালের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















