একসময় কল্পনাও করা কঠিন ছিল, কিন্তু উনিশশো ষাট ও সত্তরের দশকে ভেনেজুয়েলা পরিচিত ছিল লাতিন আমেরিকার আদর্শ গণতন্ত্র হিসেবে। তেলের দাম ধসে পড়ার পর সেই সাফল্যের ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেমে গেলে জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে সেনা কর্মকর্তা হুগো শাভেজ ক্ষমতার পথে এগিয়ে যান। ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর উনিশশো আটানব্বই সালে তিনি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন। ব্যক্তিগত ক্যারিশমা আর জনসংযোগের দক্ষতায় তিনি জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা করেন। কিন্তু সেই বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় দেশটি ধীরে ধীরে সরে যায় কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে।
তেলের পতন আর রাজনীতির মোড়
শাভেজের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ে, সংবিধান বাঁকানো হয় এবং বিরোধীদের কোণঠাসা করা শুরু হয়। প্রয়োজনীয় সেবা ভেঙে পড়লেও দীর্ঘ সরাসরি সম্প্রচারিত ভাষণের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আবেগী সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি। দুই হাজার তেরো সালে তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী নিকোলাস মাদুরো একটি দুর্বল ব্যবস্থার দায়িত্ব নেন এবং সেটিকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দেন। বিরোধীদের গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও দমন-পীড়নের পাশাপাশি দুর্নীতি ও অবিবেচক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত দেশটিকে নিয়ে যায় ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতির দিকে। একসময় মূল্যস্ফীতি পৌঁছে যায় এক লাখ ত্রিশ হাজার শতাংশে। দোকানের তাক শূন্য হয়ে পড়ে, বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে ওঠে।

শাসনের কঠোরতা আর বিরোধী আন্দোলন
এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার রাজনীতি ব্যাখ্যা করতে সাম্প্রতিক গবেষণামূলক বইগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। একাধিক লেখায় দেখানো হয়েছে, কীভাবে একটি আংশিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ একনায়কতন্ত্রে রূপ নেয়। বিশেষ করে দুই হাজার দুই সালে শাভেজবিরোধী গণআন্দোলন ছিল একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। সেনাবাহিনী তখন বিরোধীদের দমন করতে অস্বীকৃতি জানালে শাভেজ স্বল্প সময়ের জন্য ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। কিন্তু ক্ষমতার শূন্যতা কাজে লাগাতে গিয়ে এক সুযোগসন্ধানী রক্ষণশীল গোষ্ঠীর ব্যর্থ চেষ্টার মধ্য দিয়ে তিনি বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যেই আবার ফিরে আসেন।
গণতন্ত্র ভাঙনের অন্তর্নিহিত কারণ
গবেষকদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, সামাজিক খাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ থাকলেও দুর্নীতি ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণে সেবা কার্যকর হয়নি। পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখা হয়। এই দুই ব্যর্থতাই গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ভিতর থেকে ক্ষয় করে। নব্বইয়ের দশকের কারাকাসো দাঙ্গা, যেখানে শতাধিক মানুষ নিহত হয়, সেই ক্ষোভকে আরও তীব্র করে তোলে এবং ভবিষ্যতের অভ্যুত্থানের বীজ বপন করে।

বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকচিহ্ন
সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর উত্থান এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের ইঙ্গিত দেয়। তাঁর আসন্ন বই ভেনেজুয়েলার দীর্ঘ সংকটের আরেকটি অধ্যায় যোগ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে জানুয়ারি মাসের শুরুতে মাদুরোকে আটক করার সাম্প্রতিক অভিযানের পূর্ণ বিবরণ জানতে পাঠকদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।
এই ছয়টি বই ভেনেজুয়েলার ইতিহাস, রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের ভাঙনকে বুঝতে সহায়তা করে। এগুলো একসঙ্গে পড়লে স্পষ্ট হয়, কীভাবে অর্থনৈতিক ধাক্কা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন আর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা একটি দেশকে ধীরে ধীরে একনায়কতন্ত্রের পথে ঠেলে দেয়।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















