কিউবার ওপর চাপ আরও বাড়ালেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবায় তেল ও অর্থ পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়ে তিনি হাভানাকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতার পরামর্শ দেন। এই বক্তব্যের পরপরই কিউবার নেতৃত্ব কঠোর অবস্থান জানিয়ে বলেছে, তারা কোনো চাপের কাছে মাথা নত করবে না।
ভেনেজুয়েলার তেল বন্ধ, সংকটে কিউবার বিদ্যুৎ
ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে কিউবার সবচেয়ে বড় জ্বালানি সরবরাহকারী। গত বছর প্রতিদিন গড়ে প্রায় ছাব্বিশ হাজার পাঁচশ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি কিউবায় পাঠানো হতো। তবে চলতি জানুয়ারির শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক হওয়ার পর এবং কঠোর তেল অবরোধ আরোপের ফলে ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবার পথে আর কোনো জাহাজ ছাড়েনি। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে কিউবার বিদ্যুৎ উৎপাদনে। দেশজুড়ে দীর্ঘ লোডশেডিং, এমনকি রাজধানী হাভানাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকার নেমে আসছে।

ট্রাম্পের কড়া বার্তা ও সমঝোতার ইঙ্গিত
নিজের সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কিউবায় আর এক ফোঁটা তেল বা অর্থ যাবে না। তিনি দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার তেল ও অর্থের ওপর নির্ভর করেই কিউবা বহু বছর টিকে ছিল। তাই দেরি হওয়ার আগেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তিতে আসার পরামর্শ দেন তিনি। তবে কী ধরনের সমঝোতার কথা বলা হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
কিউবার প্রেসিডেন্টের পাল্টা জবাব
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল ট্রাম্পের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, কিউবা স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। কেউ তাদের নির্দেশ দিতে পারে না। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ছেষট্টি বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক অবস্থান নিয়েছে, অথচ কিউবা কখনো আক্রমণ করেনি। প্রয়োজনে মাতৃভূমি রক্ষায় শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াইয়ের জন্য দেশ প্রস্তুত বলেও ঘোষণা দেন তিনি।

আমদানির অধিকার নিয়ে কিউবার অবস্থান
কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ বলেন, যেকোনো দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির অধিকার কিউবার রয়েছে। নিরাপত্তা সহায়তার বিনিময়ে কোনো দেশ থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। এদিকে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে কিউবার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য নিহত হওয়ার কথাও নিশ্চিত করেছে হাভানা, যদিও সহযোগিতার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
মেক্সিকো বিকল্প হলেও সরবরাহ সীমিত
ভেনেজুয়েলার সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় মেক্সিকো কিউবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠছে। তবে পরিমাণ এখনো সীমিত। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম জানিয়েছেন, সরবরাহ বড় আকারে না বাড়লেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে মেক্সিকো কিউবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়েছে। কিউবা খোলা বাজার থেকেও কিছু জ্বালানি কিনছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

জনগণের কণ্ঠে ক্ষোভ ও প্রত্যাশা
দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট, খাদ্য ও ওষুধের সংকটে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে। গত পাঁচ বছরে অভূতপূর্ব সংখ্যক কিউবান দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। হাভানার এক বাসিন্দা বলেন, বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছুই নেই। পরিবর্তন দরকার এবং দ্রুত দরকার। আবার কেউ কেউ ট্রাম্পের হুমকিকে ভয় না পাওয়ার কথাও জানান, বলছেন কিউবান জনগণ সবকিছুর জন্য প্রস্তুত।
ওয়াশিংটনের কৌশল ও আঞ্চলিক বার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, কিউবাকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোরতা পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব জোরদারের কৌশলের অংশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপের পর কিউবার ওপর চাপ বাড়লে হাভানার অবস্থান নড়বড়ে হতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ মনে করে, কিউবার অর্থনীতি চাপে থাকলেও দেশটি অবিলম্বে ভেঙে পড়ার অবস্থায় নেই।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















