যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয় স্বাস্থ্য সাময়িকী থেকে উঠে আসা এই প্রতিবেদন এখন আন্তর্জাতিক প্রোটিন খাদ্যবাজারে তীব্র আলোচনার কেন্দ্রে। প্রোটিন বারকে আরও কার্যকর, কম ক্যালরির ও উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ করার প্রতিযোগিতায় একটি বিশেষ উপাদান ঘিরে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, তা শুধু ব্যবসায়িক লড়াই নয়, বরং স্বাস্থ্যবোধ, নৈতিকতা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও সামনে এনেছে।
হঠাৎ ইমেইলে ভেঙে পড়া স্বপ্ন
গত বছরের বসন্তে এক সকালে একটি ইমেইল পড়ে স্তব্ধ হয়ে যান উদ্যোক্তা ম্যাকে ফুগাল। ভদ্র ভাষায় লেখা সেই বার্তায় জানানো হয়, তাদের ব্যবহৃত বিশেষ চর্বি বিকল্প উপাদানের সরবরাহ আর পাওয়া যাবে না। কোনো আলোচনা নয়, কোনো আগাম সতর্কতাও নয়। এত দিন ধরে গড়ে তোলা কম চর্বি ও উচ্চ প্রোটিনের চকলেট বারের ভবিষ্যৎ এক মুহূর্তে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
স্টার্টআপের সংগ্রাম ও বাজারের ফাঁক
ফুগাল দম্পতি তিন বছর ধরে নিজেদের স্বপ্নের উদ্যোগ গড়ে তুলছিলেন। লক্ষ্য ছিল এমন একটি প্রোটিন বার তৈরি করা, যা স্বাদে ভালো হবে, আবার ক্যালরিও থাকবে নিয়ন্ত্রণে। চিনি কমানো সহজ হলেও চর্বি কমিয়ে স্বাদ ও গঠন ধরে রাখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই জায়গায় তারা ভরসা করেছিলেন পরীক্ষাগারে তৈরি এক বিশেষ চর্বি বিকল্পের ওপর, যা কম ক্যালরিতে চকলেটের মতো অনুভূতি দিতে সক্ষম।
নতুন ব্র্যান্ডের উত্থান ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ
সমস্যার মূল সূত্রপাত হয় যখন এক নতুন প্রোটিন বার ব্র্যান্ড বিপুল সাফল্য পায় এবং ওই বিশেষ উপাদান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি কিনে নেয়। ফলাফল হিসেবে অন্য ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য সেই উপাদানের দরজা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বাজারে কম চিনি, বেশি প্রোটিন ও কম ক্যালরির বার হিসেবে এই নতুন ব্র্যান্ড দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় এবং কয়েক মাসেই কোটি কোটি ডলারের বিক্রি ছুঁয়ে ফেলে।
আদালতে গড়ানো লড়াই
এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি ছোট খাদ্য উদ্যোগ একসঙ্গে আদালতের দ্বারস্থ হয়। তাদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য উপাদানের সরবরাহ আটকে দিয়ে বাজারে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা হয়েছে, যা নতুন উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতাকে থামিয়ে দিচ্ছে। পাল্টা যুক্তিতে বড় কোম্পানির দাবি, বাজারে তাদের অংশ খুবই কম এবং তারা শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে সরবরাহ নিশ্চিত করেছে।
অতীতের অভিজ্ঞতা ও স্বাস্থ্যভীতি
এই চর্বি বিকল্প উপাদান ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। নব্বইয়ের দশকে একবার এমনই এক উপাদান স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে জনরোষের মুখে পড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বিজ্ঞানীরা আরও সহনীয় ও তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প তৈরি করেন। গবেষণায় বলা হয়েছে, সীমিত পরিমাণে এই উপাদান গ্রহণ সাধারণত সহনীয় হলেও অতিরিক্ত গ্রহণে পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
নতুন প্রোটিন বার বাজারে আসার পর সামাজিক মাধ্যমে প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাও বাড়তে থাকে। কেউ বলছেন, এটি অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার; আবার কেউ দাবি করছেন, সীমিত পরিমাণে এটি কার্যকর ও নিরাপদ। কিছু ভোক্তা হজমজনিত সমস্যার কথাও জানিয়েছেন, যা বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
ব্যবসা বনাম নৈতিকতা
বড় কোম্পানির বক্তব্য, তারা সরবরাহ নিশ্চিত না করলে চাহিদা সামলানো সম্ভব হতো না। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেনা নিজেই অবৈধ নয়, তবে এতে ভোক্তাদের ক্ষতি প্রমাণিত হলে বিষয়টি অন্য দিকে যেতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, এতে বাজারে স্বাস্থ্যকর বিকল্পের সংখ্যা কমে যাবে।
সামনে কী
এই মামলা এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। একদিকে দ্রুত বাড়তে থাকা প্রোটিন খাবারের বাজার, অন্যদিকে স্বাস্থ্য, সহনশীলতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার প্রশ্ন। ছোট উদ্যোক্তারা আশা করছেন, তারা আবার সেই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে প্রবেশাধিকার পাবেন। আর বড় ব্র্যান্ড বলছে, ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়লে অন্যদের জন্য দরজা খুলতে পারে।
এই লড়াই শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা শুধু একটি প্রোটিন বারের ভবিষ্যৎ নয়, বরং পুরো স্বাস্থ্যখাদ্য শিল্পের দিকনির্দেশ ঠিক করে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















