বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার ইস্যুতে আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগ ‘তিনটি আশঙ্কা’র কথা জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বলে সোমবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। বিসিবিও একটি বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, আইসিসি ও বিসিবির মধ্যে নিরাপত্তা ইস্যুতে অভ্যন্তরীণ একটি যোগাযোগের অংশ ওই চিঠি।
সেই চিঠিটি বিবিসি বাংলার হাতে এসেছে।
চিঠিটি মূলত একটি ইমেইল, যেটি আইসিসির সিকিউরিটি ম্যানেজার বা নিরাপত্তা বিভাগের ব্যবস্থাপক পাঠিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টাকে। মেইলটি পাঠানো হয়েছে ৮ই জানুয়ারি।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এবং বাংলাদেশের সমর্থকরা ভারতে বিশ্বকাপে অংশ নিতে গেলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, মূলত সেটিই মেইলের বিষয়বস্তু। মেইলে বাংলাদেশ টিমের ‘রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট সামারি’ বা ঝুঁকি মূল্যায়ন করে তার সারাংশ জানিয়েছেন আইসিসির সিকিউরিটি ম্যানেজার।
সাধারণত, আইসিসি যে কোনো আসর আয়োজনের ক্ষেত্রে এই ধরনের ‘রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ বা ঝুঁকি মূল্যায়ন করে থাকে, যেখানে পুরো আসরের আগে ঝুঁকির মাত্রা মূল্যায়নের পাশাপাশি প্রতিটি ভেন্যুকে ঘিরে প্রতিটি দলের ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এই ঝুঁকি মূল্যায়নের পর সাধারণত প্রতিটি দলের জন্য প্রতিবেদন দেয়া হয়।
এই বিশ্লেষণে আসলে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়, যাতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা বা ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
যা রয়েছে আইসিসির মেইলে
মেইলের শুরুতে তেসরা জানুয়ারি মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দিতে বিসিসিআইয়ের নির্দেশনা, নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ভারতের বদলে শ্রীলঙ্কায় খেলতে চাওয়ার দাবি এবং মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধ করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর চারটি বিষয়ে আলাদা করে বাংলাদেশ দলের ভারত সফরের ঝুঁকির মূল্যায়ন করা হয়েছে।
ক্রিকেট বিষয়ক ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফো তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে এই ‘রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ আইসিসির সার্বজনীন একটি ‘স্ট্যান্ডার্ড ক্যাটাগোরাইজেশন’ বা আদর্শ শ্রেণিবিন্যাস, যেখানে সাধারণত খেলার ভেন্যু পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট কারণ উল্লিখিত থাকে না।

তেসরা জানুয়ারি মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দিতে আইপিএলের দল কোলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দেয় ভারতের ক্রিকেট বোর্ড
১. মোস্তাফিজ ইস্যু
ভারতে টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজনের ঝুঁকি পর্যালোচনা সম্পন্ন হয়েছে ডিসেম্বরে এবং পুরো আসর ঘিরে ঝুঁকির মাত্রা ‘মডারেট’ বা মাঝারি মাত্রার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের জন্য এই ঝুঁকির মাত্রা ‘মডারেট টু হাই’ বা মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার বলে জানানো হয়েছে মেইলে।
অর্থাৎ, অন্যান্য দলের জন্য ঝুঁকির মাত্রা মাঝারি হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার বলে উঠে আসে ঐ মূল্যায়নে।
সেই প্রাথমিক মূল্যায়নের পর বাংলাদেশ দলের ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করতে আরেক দফায় ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়, যেখানে বাংলাদেশ দলের জন্যও মাঝারি মাত্রার রিস্ক রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এর সাথে যোগ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ দলের সাথে মোস্তাফিজুর রহমানের উপস্থিতি সমস্যার কারণ হতে পারে যদি ‘ধর্মীয় উগ্রপন্থার বিষয়টি জড়িত হয়।’
২. বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা ইস্যু
বেঙ্গালুরুতে ওয়ার্ম আপ ম্যাচের পাশাপাশি কোলকাতায় তিনটি ও মুম্বাইয়ে একটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে বাংলাদেশের।
ম্যাচের সময় ও প্রতিপক্ষ বিবেচনায় এসব ম্যাচে বাংলাদেশ দলের ঝুঁকি ‘মিডিয়াম-লো’ বা মাঝারি থেকে কম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেখানে ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের একজন কর্মকর্তা সি ভি মুরালিধরের একটি মূল্যায়নের উল্লেখও করা হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন যে সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে ঝুঁকির মূল্যায়ন পরিবর্তন হয়নি এবং তিনি (মি. মুরালিধর) আত্মবিশ্বাসী যে এমন কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হবে না যা আসরের (বিশ্বকাপের) বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী নিরসন করা যাবে না।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার ইস্যুতে আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগ ‘তিনটি আশঙ্কা’র কথা জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বলে সোমবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল
৩. সমর্থকদের নিরাপত্তা ইস্যু
ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ইতিহাস ও নিশ্চয়তার ভিত্তিতে মেইলে উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশ দল বা অন্য কোনো অংশগ্রহণকারী দল কোলকাতা বা মুম্বাইয়ে বড় ধরনের সহিংসতার শিকার হবে বা হঠাৎ তাদের জন্য ঝুঁকির মাত্রা বৃদ্ধি পাবে, এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
এই দুই ভেন্যুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দলের ঝুঁকি মাঝারি মাত্রার বলে উল্লেখ করা হয়েছে মেইলে।
তবে এই দুই জায়গায় বাংলাদেশি সমর্থকদের – বিশেষ করে যারা দলের জার্সি পরে বা আলাদা ছোট দলে স্টেডিয়ামে যাবেন – ঝুঁকির মাত্রা মাঝারি থেকে উচ্চ পর্যায়ের বলে উঠে এসেছে বিশ্লেষণে।
পাশাপাশি, বিশ্বকাপ আসর ঘিরে যদি কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটে তাহলে তা আশেপাশের বড় এলাকা জুড়ে সহিংসতা ও বিক্ষোভ তৈরি করতে পারে।
ওই প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা হয় যে মসজিদ পোড়ানো, বড় ধরনের দাঙ্গা বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হত্যার মত ঘটনা দুই দেশের কোনো একটি দেশে ঘটলে উত্তেজনা বাড়তে পারে এবং তা দলের জন্য ঝুঁকির মাত্রা বৃদ্ধি করবে।
এই ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কম থাকলেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে উঠে এসেছে মেইলে।
৪. বাংলাদেশের নির্বাচন ইস্যু
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের রেশ – বিশেষ করে ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে – পুরো অঞ্চলে ‘শর্ট টু মিডিয়াম টার্মে’ বা স্বল্প থেকে মাঝারি সময়কাল পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে বলে বলা হয়েছে আইসিসির ঝুঁকি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে।
তবে এই মুহূর্তে এই উত্তেজনা খেলার ভেন্যু বা খেলোয়াড়দের প্রতি সহিংসতায় পরিণত হবে না বলে উঠে এসেছে মেইলে।
বাংলাদেশ দলের ও খেলোয়াড়দের প্রতি ঝুঁকি এই ক্ষেত্রে মাঝারি বলেই উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে।
তবে এই ক্ষেত্রে নির্ধারিত ভেন্যুগুলোতে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা পরিকল্পনার বিষয়ের ‘ফুল রিভিও’ বা সম্পূর্ণ পর্যালোচনা করার বিষয়টিও উঠে এসেছে অ্যাসেসমেন্টে।

ক্রীড়া উপদেষ্টার মন্তব্যের কয়েকঘণ্টা পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড একটি বিবৃতি দিয়েছে
মেইলের শেষাংশে উল্লেখ করা হয়েছে যে কৌশলগত নিরাপত্তা পরিকল্পনা এখন দুই বোর্ডের দুজন স্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থাপকের কাছে পর্যালোচনার জন্য রয়েছে।
শেষ লাইনে বিসিবির নিরাপত্তা উপদেষ্টার উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে যে এই বিষয়ে তার মূল্যায়ন ও মন্তব্যকে স্বাগত জানানো হবে যেন বিসিবির দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো ঝুঁকি বা উদ্বেগ থাকলে তা সমন্বিতভাবে নিরসন করা যায়।
বিসিবি’র বিবৃতি
ক্রীড়া উপদেষ্টার মন্তব্যের কয়েকঘণ্টা পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, সম্প্রতি ভারতে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের নিরাপত্তা ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা যেসব মন্তব্য করেছেন, তা আসলে আইসিসি ও বিসিবির অভ্যন্তরীণ একটি আলাপের উদ্বৃতি।
সেখানে আইসিসি টি টোয়েন্ট বিশ্বকাপ চলার সময় বাংলাদেশ দলের ভারত সফরকালে সম্ভাব্য ঝুঁকি পর্যালোচনা নিয়ে আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগ ও বিসিবির মধ্যে আলাপ হয়।
কিন্তু নিরাপত্তার কারণে ভারত থেকে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো অন্য দেশে সরিয়ে নিতে বাংলাদেশ যে অনুরোধ জানিয়েছে, এটা তার কোনো জবাব নয়।
বিসিবি জানিয়েছে, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ভেন্যু পরিবর্তন করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু সেই বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসির কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
বিবিসি নিউজ বাংলা
Sarakhon Report 



















