রাজধানীজুড়ে গ্যাসের তীব্র সংকটে রান্নাবান্না এখন বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে। পাইপলাইনের গ্যাস হোক বা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস, দুই ক্ষেত্রেই সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেওয়ায় সাধারণ মানুষ পড়েছে চরম ভোগান্তিতে। এই সংকটের সুযোগে বিকল্প রান্নার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক চুলার বাজারে হঠাৎ করেই বেড়েছে চাহিদা, আর সেই সঙ্গে বেড়েছে দামও।
এলপিজি সংকটে হঠাৎ বিপাকে পরিবার
কাজীপাড়ার বাসিন্দা সাইমুন নাহার পারুমা দীর্ঘদিন ধরেই এলপিজি সিলিন্ডারে রান্না করেন। সাধারণ সময়ে সিলিন্ডার শেষ হলে ডিলারের লোক দ্রুতই নতুন সিলিন্ডার পৌঁছে দিত। কিন্তু সম্প্রতি এক রাতে সিলিন্ডার শেষ হয়ে যাওয়ার পর আর গ্যাস পাওয়া যায়নি। পরদিন আশপাশের এলাকায় খোঁজ করেও কোথাও সিলিন্ডার না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক ইনডাকশন চুলা কিনতে হয় তাকে।

পারুমার ভাষ্য, বাড়িতে ছোট দুই সন্তান থাকায় বাইরে থেকে খাবার আনার সুযোগ সীমিত। গ্যাস না পেয়ে বেশি দাম দিয়েও ইনডাকশন চুলা কিনতে হয়েছে। যেখানে সাধারণত সাড়ে তিন হাজার টাকার চুলা, সেখানে দিতে হয়েছে চার হাজার দুইশ টাকা। দোকানদার জানিয়েছেন, প্রায় সব চুলার দামই হঠাৎ করে পাঁচশ টাকা বা তার বেশি বেড়েছে।
সরবরাহ সংকট ও সরকারি পদক্ষেপ
এক মাসের বেশি সময় ধরে এলপিজি সরবরাহ কম থাকায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। সিলিন্ডারের আকারভেদে দাম বেড়েছে তিনশ থেকে হাজার টাকারও বেশি। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার শুল্কছাড়, আমদানি সহজ করা এবং কোটা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নিলেও শিগগির সংকট কাটার ইঙ্গিত মিলছে না।
সরকার নির্ধারিত দামে বাজারে এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি বাড়তি দাম দিয়েও অনেক সময় গ্যাস মিলছে না। এর প্রভাব পড়েছে এলপিজিনির্ভর রেস্তোরাঁ ও ছোট খাবারের দোকানগুলোর ওপরও।

পাইপলাইনের গ্যাসেও ভরসা নেই
এলপিজির পাশাপাশি পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহারকারীরাও সমস্যায় পড়েছেন। মগবাজারের গুলবাগ এলাকার বাসিন্দা খাদিজা বেগম জানান, শীতের শুরু থেকে গ্যাসের চাপ কম ছিল। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রায় সারাদিনই গ্যাস থাকে না। গভীর রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস এলেও ভোরের আগেই বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘদিন এভাবে চলতে না পেরে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে একটি বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। যদিও এতে রান্না করতে সময় বেশি লাগে, তবু অন্য কোনো বিকল্প নেই বলে জানান খাদিজা।
বৈদ্যুতিক চুলার বাজারে হঠাৎ উল্লম্ফন
গ্যাস সংকটে নতুন করে অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে শুরু করায় রাজধানীর ক্রোকারিজ দোকানগুলোতে বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ। বিক্রেতারা বলছেন, চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় চুলাপ্রতি দাম বাড়ানো হয়েছে পাঁচশ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত।

মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটের এক দোকানি জানান, আগে মাসে দুয়েকটি চুলা বিক্রি হলেও এখন প্রতিদিনই দুই থেকে তিনটি চুলা বিক্রি হচ্ছে। কিছু ব্র্যান্ডের পণ্য বেশি দামে কিনতে হওয়ায় দাম কিছুটা বাড়লেও সাড়ে তিন হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকার মধ্যেই চুলা পাওয়া যাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড, কোনটা কেন জনপ্রিয়
বাজারে মূলত দুই ধরনের বৈদ্যুতিক চুলা বেশি দেখা যাচ্ছে—ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড। ইনফ্রারেড চুলায় সব ধরনের হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার করা যায় বলে এর চাহিদা তুলনামূলক বেশি। তবে ইনডাকশন চুলায় বিশেষ ধরনের চুম্বকীয় তলযুক্ত পাত্র প্রয়োজন হয়।
ইনডাকশন চুলা তড়িৎ চৌম্বকীয় আবেশের মাধ্যমে সরাসরি পাত্রে তাপ তৈরি করে, ফলে বিদ্যুৎ খরচ তুলনামূলক কম হয়। অন্যদিকে ইনফ্রারেড চুলায় হিটিং উপাদান সরাসরি গরম হয়ে তাপ ছড়ায়, এতে চুলার কাচের উপরিভাগও গরম হয়ে যায়।

ব্র্যান্ড ও নন-ব্র্যান্ডের দামের ফারাক
ওয়ালটন, ভিশন, ভিগো, কিয়াম, গাজী, মিয়াকো, ফিলিপসসহ বিভিন্ন পরিচিত ব্র্যান্ডের চুলা বাজারে বেশি বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি নন-ব্র্যান্ডের চাইনিজ চুলাও পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন মার্কেটে। চাহিদা বেশি থাকায় অনেক ক্ষেত্রে নন-ব্র্যান্ডের চুলাও পরিচিত ব্র্যান্ডের কাছাকাছি দামে বিক্রি হচ্ছে।
চেইনশপগুলোতে আপাতত আগের দামেই চুলা পাওয়া গেলেও বিক্রেতারা জানিয়েছেন, বর্তমান মজুত শেষ হলে নতুন চালানে দাম আরও বাড়তে পারে।
কোম্পানিগুলোর বিক্রি বেড়েছে
দেশে ভিশন ও ভিগো ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলা উৎপাদন ও বাজারজাতকারী একটি শিল্পগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে তাদের চুলার বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় চল্লিশ শতাংশ বেড়েছে। তবে তাদের দাবি, উৎপাদন সক্ষমতা থাকায় বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং আপাতত দাম বাড়ানো হয়নি।
গ্যাস সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈদ্যুতিক চুলার বাজারে এই চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















