দ্বৈত নাগরিকত্ব ও মনোনয়ন বাতিলের অভিযোগ
দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণপত্র দেখানোর নামে প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল এবং একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে বিএনপি। মঙ্গলবার ঢাকায় নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকে এসব অভিযোগ তোলে দলটি।
বিএনপির চার সদস্যের প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্ব দেন দলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান। বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের অন্যান্য কমিশনার ও জ্যেষ্ঠ সচিব উপস্থিত ছিলেন।

সংবিধানের বিধান ও বাস্তব পরিস্থিতি
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে নজরুল ইসলাম খান বলেন, দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি শুধু বিএনপির নয়, অন্য দলগুলোর প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি করছে। সংবিধান অনুযায়ী কেউ বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে নির্বাচন করার যোগ্য হন। হলফনামায় কেবল বিদেশি নাগরিকত্ব আছে কি না, তা উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণপত্র জমা দেওয়ার কোনো শর্ত নেই।
তিনি অভিযোগ করেন, মাঠপর্যায়ে রিটার্নিং কর্মকর্তারা এই প্রমাণপত্র না থাকার অজুহাতে মনোনয়ন বাতিল করছেন এবং নির্বাচন কমিশনে আপিলেও কিছু প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হচ্ছে। একই কারণে জামায়াতে ইসলামীর দুই প্রার্থীর মনোনয়নও বাতিল হয়েছে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে সব দলের প্রার্থীদের জন্য সমানভাবে পুনর্বিবেচনার দাবি জানায় বিএনপি।
বিদেশে থাকা প্রার্থীদের প্রসঙ্গ
নজরুল ইসলাম খান বলেন, গত ১৫–১৬ বছরে দমনমূলক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক নেতা-কর্মী বিদেশে থাকতে বাধ্য হন। সেই সময় কেউ কেউ বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তারা দেশে ফিরে এসে সেই নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন এবং সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্য হয়েছেন।

তিনি বলেন, কেবল কারিগরি অজুহাত বা কাগজপত্রের ঘাটতির কারণে যদি এসব প্রার্থীকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়, তাহলে তা হবে চরম অবিচার। এতে জনগণ যে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করছে, তা ব্যাহত হবে।
পোস্টাল ব্যালটে ধানের শীষ কম দৃশ্যমান করার অভিযোগ
বিএনপি নেতা আরও অভিযোগ করেন, বিদেশে পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে কিছু দলের নাম ও প্রতীক প্রথম সারিতে স্পষ্টভাবে রাখা হলেও বিএনপির নাম ও ‘ধানের শীষ’ প্রতীক ভাঁজের মাঝখানে রাখা হয়েছে। এতে ব্যালট ভাঁজ করলে বিএনপির প্রতীক কম চোখে পড়ে।
তিনি বলেন, দেশে ও বিদেশে কোনো পোস্টাল ব্যালটেই এমন কৌশল গ্রহণ করা উচিত নয় এবং এই অনিয়ম অবিলম্বে সংশোধন করতে হবে।
বিদেশে ব্যালট বিতরণ ও ভিডিও বিতর্ক
বিদেশে পোস্টাল ব্যালট বিতরণ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তোলে বিএনপি। নজরুল ইসলাম খান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বাহরাইনে একটি দলের নেতাদের হাতে大量 ব্যালট পেপার দেখা যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বিষয়টি তারা জেনেছে এবং বাহরাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কমিশন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

ভোটার তথ্য সংগ্রহ নিয়ে শঙ্কা
একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে সারা দেশে ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহের অভিযোগও তোলে বিএনপি। নজরুল ইসলাম খান বলেন, এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য সন্দেহজনক এবং আগে কখনো দেখা যায়নি। এর মাধ্যমে ভুয়া ভোটার তৈরি বা ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা থাকতে পারে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবার নম্বর সংগ্রহ মানে অর্থ লেনদেনের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপ চায় বিএনপি।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার হালচাল
উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ একসঙ্গে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ওপর গণভোট আয়োজনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ৩০০ আসনে মোট ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৪২টি মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়, ৭২৩টি অবৈধ হয় এবং বাকিগুলো যাচাই হয়নি।
মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে করা ৬৪৫টি আপিল আবেদন শুনানি ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ১৮ জানুয়ারির মধ্যে এসব আপিলের শুনানি শেষ করার কথা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















