আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্কের পুরোনো ধারা থেকে সরে এসে নতুন কৌশলে হাঁটছে ইউরোপ। অ্যাঙ্গোলার রাজধানী লুয়ান্ডায় অনুষ্ঠিত আফ্রিকান ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সপ্তম শীর্ষ বৈঠকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এই পরিবর্তন। প্রতিশ্রুতি আর অনুদানের বদলে এবার গুরুত্ব পেয়েছে যৌথ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং বাস্তব শিল্পমূল্য তৈরির বিষয়টি।
লুয়ান্ডা সম্মেলনের তাৎপর্য
লুয়ান্ডার সমুদ্রতীর ধরে নেতাদের বহর এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই প্রতীকীভাবে ফুটে উঠেছিল এই নতুন অধ্যায়ের সূচনা। শীর্ষ বৈঠকে ইউরোপ প্রথমবারের মতো আফ্রিকার খনিজ সম্পদ নিজস্ব ভূখণ্ডে প্রক্রিয়াজাত করার দাবিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। একই সঙ্গে নীল অর্থনীতি ও আঞ্চলিক সবুজ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলাকে কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আফ্রিকা-ইউরোপ সম্পর্কে গত এক দশকের সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন।
খনিজ সম্পদের মূল্য সংযোজনের স্বীকৃতি
দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকার অভিযোগ ছিল, ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য কাঠামো একতরফা এবং কাঁচামাল রপ্তানিনির্ভর। লুয়ান্ডা সম্মেলনে সেই জায়গাতেই বড় অগ্রগতি এসেছে। ইউরোপ জানিয়েছে, আফ্রিকায় খনিজ পরিশোধনাগার, স্মেল্টার ও ব্যাটারি উপকরণ উৎপাদন স্থাপনে অর্থায়নের পথ খুলতে তারা প্রস্তুত। এতে আফ্রিকার শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরির স্বপ্ন বাস্তবের দিকে এক ধাপ এগোল।
বিনিয়োগের শেষ ধাপই বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নই এখন বড় পরীক্ষা। আফ্রিকা ও ইউরোপ ফাউন্ডেশনের মতে, আসল সংকট শেষ ধাপে, অর্থাৎ দ্রুত ও বড় পরিসরে প্রকল্পে অর্থ পৌঁছে দেওয়া। ঝুঁকি নিয়ে ভুল ধারণা, জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং ধীর অর্থছাড় এতদিন বড় বাধা ছিল। তবে এবার এই মানসিকতা ভাঙার ইঙ্গিত মিলছে।

বহুমুখী কূটনীতি ও ইউরোপের চাপ
বর্তমানে আফ্রিকার দেশগুলো কেবল ইউরোপের ওপর নির্ভরশীল নয়। চীন, উপসাগরীয় দেশ, ভারত, তুরস্ক ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তৃত হওয়ায় আফ্রিকার দরকষাকষির ক্ষমতা বেড়েছে। এই বাস্তবতা ইউরোপকে আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজ করতে বাধ্য করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ঝুঁকি ভাবনা বদলাতে নতুন তথ্য ভান্ডার
ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, আফ্রিকায় বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে ভুল ধারণা রয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য ভান্ডার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ঋণ ঝুঁকির দিক থেকে আফ্রিকা অনেক ক্ষেত্রেই তুলনামূলক নিরাপদ। এই তথ্য সামনে আসায় ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তের ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তন
দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত বিশ শীর্ষ বৈঠকের পরপরই লুয়ান্ডা সম্মেলন ইউরোপের নতুন মনোভাবকে আরও স্পষ্ট করেছে। খনিজ প্রক্রিয়াকরণে সমর্থন, ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং যৌথ শিল্পায়নের ধারণা এখন আর প্রান্তিক নয়, বরং সম্পর্কের কেন্দ্রে। এই পরিবর্তন বাস্তবে কতটা রূপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















