উত্তর মেরুর কাছাকাছি আর্কটিক অঞ্চলে স্বালবার্ড দীর্ঘদিন ধরেই ছিল এক ব্যতিক্রমী ভূরাজনৈতিক এলাকা। নরওয়ের অংশ হলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর করা বিশেষ চুক্তির আওতায় এই দ্বীপপুঞ্জে বিশ্বের বহু দেশের নাগরিকেরা ভিসা ছাড়াই বসবাস, গবেষণা ও কাজ করার সুযোগ পেতেন। বিজ্ঞানী, শ্রমিক, পর্যটক ও গবেষকদের সহাবস্থানে স্বালবার্ড হয়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক অনন্য প্রতীক। তবে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

নরওয়ের নতুন কঠোর অবস্থান
সাম্প্রতিক সময়ে নরওয়ে স্বালবার্ডে নিজের সার্বভৌম কর্তৃত্ব আরও স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয়েছে। বিদেশিদের স্থানীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার বাতিল করা হয়েছে, বিদেশি নাগরিকদের কাছে জমি বিক্রি কার্যত বন্ধ করা হয়েছে এবং সমুদ্রতলসহ বিস্তীর্ণ জলসীমার ওপর নরওয়ের দাবি জোরালো করা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বৈরী শক্তির প্রভাব ঠেকাতে এই পদক্ষেপ।
এই অবস্থান বহু দশকের আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। চীনা গবেষক, রুশ কয়লা শ্রমিক, এমনকি দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী অভিবাসীরাও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
আর্কটিক রাজনীতির নতুন বাস্তবতা
উষ্ণায়নের ফলে আর্কটিক অঞ্চলে প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্ব বাড়ছে। স্বালবার্ডের আশপাশের সমুদ্রতলে তামা, দস্তা, কোবাল্ট, লিথিয়াম ও বিরল খনিজের বিপুল সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে গবেষণায়। এই খনিজগুলো আধুনিক প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নরওয়ে এই সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চাইছে, যা ইউরোপীয় দেশ ও রাশিয়ার আপত্তির কারণ হয়েছে।
রাশিয়া ও চীনের উপস্থিতি
স্বালবার্ডে রাশিয়ার উপস্থিতি শতাব্দীপ্রাচীন। বারেন্টসবার্গে রুশ কয়লা খনি এখনো চালু আছে, যদিও জনসংখ্যা অনেক কমেছে। সাম্প্রতিক সময়ে রুশ অর্থোডক্স চার্চের স্থায়ী পুরোহিত নিয়োগ নরওয়েজীয় নিরাপত্তা মহলে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চীনের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ কম নয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের ভেতরে চীনা গবেষণা কেন্দ্র ঘিরে সামরিক গবেষণার সন্দেহ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু আইনপ্রণেতা। নরওয়ে এসব প্রতীক ও কার্যক্রমকে নিজের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছে।

স্থানীয় জীবনের পরিবর্তন
স্বালবার্ডের প্রধান শহর লংইয়ারবিয়েনে এখন প্রায় পঞ্চাশ দেশের মানুষ বাস করেন। এক সময়ের মুক্ত সমাজে সাম্প্রতিক বিধিনিষেধ বিদেশি বাসিন্দাদের মধ্যে ভীতি ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। থাইল্যান্ড থেকে আসা দুই ভাই, যারা শৈশব থেকেই এখানে বড় হয়েছেন, নিজেদের নরওয়েজীয় মনে করলেও নতুন নিয়মে ভোটাধিকার হারিয়ে উদ্বিগ্ন।
ভবিষ্যৎ কোন পথে
স্বালবার্ড এখন আর দূরবর্তী নির্জন দ্বীপ নয়। স্যাটেলাইট তথ্য, সামরিক নজরদারি ও খনিজ সম্পদের কারণে এটি হয়ে উঠেছে আর্কটিক আধিপত্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নরওয়ে বলছে, নিজের ভূখণ্ড রক্ষা ছাড়া তাদের উপায় নেই। তবে সমালোচকেরা মনে করছেন, এই কঠোরতা স্বালবার্ড চুক্তির মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















