ওয়েলসের মারগাম কান্ট্রি পার্কে ইতিহাস যেন স্তরে স্তরে লুকিয়ে আছে। আয়রন যুগের পাহাড়ি দুর্গ, মধ্যযুগীয় অ্যাবের ধ্বংসাবশেষ আর উনিশ শতকের দুর্গের পাশে এবার যুক্ত হলো আরও এক বিস্ময়। মাটির মাত্র তিন ফুট নিচে মিলেছে ওয়েলসে এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া সবচেয়ে বড় একক রোমান ভিলা কাঠামোর ছাপ।
প্রত্নতত্ত্ববিদদের ভাষায়, এই আবিষ্কার প্রমাণ করছে যে ওয়েলসকে শুধু রোমান সাম্রাজ্যের প্রান্তিক অঞ্চল ভাবার ধারণা ভুল। বরং ব্রিটানিয়া প্রদেশের মূল ভূখণ্ডের মতোই রোমান প্রভাব এখানে ছিল গভীর ও বিস্তৃত।
হরিণ উদ্যানের নিচে অক্ষত ইতিহাস
মারগাম কান্ট্রি পার্কের এই অংশটি বহু শতাব্দী ধরে হরিণের উদ্যান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কৃষিকাজ বা বড় ধরনের নির্মাণ না হওয়ায় মাটির নিচের কাঠামো প্রায় অক্ষত রয়ে গেছে। আধুনিক ভূ-ভৌতিক জরিপের মাধ্যমে এই ভিলার অস্তিত্ব ধরা পড়ে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চৌম্বক জরিপ ও ভূমি রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির নিচের কাঠামোর স্পষ্ট ত্রিমাত্রিক চিত্র পাওয়া গেছে।
সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আলেকজান্ডার ল্যাংল্যান্ডস, যিনি এই গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, প্রথম ছবিগুলো দেখে নিজের উচ্ছ্বাস লুকোতে পারেননি। তিনি বলছেন, এই আবিষ্কার তার কাছে যেন পোর্ট ট্যালবটের পম্পেই। শিশু বয়সের মতো উত্তেজনায় ভরে উঠেছিলেন তিনি।
রোমান ব্রিটেনের অস্থির সময়ের সাক্ষ্য
জরিপে দেখা গেছে, ভিলাটি প্রায় তেতাল্লিশ মিটার বাই পঞ্চান্ন মিটার জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। কাঠামোর দুর্গসদৃশ নকশা ইঙ্গিত দেয়, পূর্ব ও পশ্চিম দিক থেকে সম্ভাব্য আক্রমণের কথা মাথায় রেখেই এটি তৈরি করা হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় তেতাল্লিশ সালে শুরু হওয়া ব্রিটেনে রোমান শাসনের শেষ দিকের শতকগুলো ছিল অস্থিরতায় ভরা, তখন এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজনীয় ছিল।
রোমানরা আদিবাসী গোত্রগুলোর প্রতিরোধ সত্ত্বেও ওয়েলসের বড় অংশ দখল করেছিল। তবে এতদিন পর্যন্ত এখানে পাওয়া বেশিরভাগ রোমান নিদর্শন ছিল সামরিক দুর্গ বা অস্থায়ী শিবিরের। সেই প্রেক্ষাপটে এত বড় একটি ভিলার সন্ধান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সীমান্ত নয়, রোমান কেন্দ্রের অংশ
গবেষকদের মতে, এই ভিলা ইংল্যান্ডের রোমান কেন্দ্রাঞ্চলে থাকা ভিলাগুলোর সঙ্গে আকার ও মর্যাদায় তুলনীয়। এতে স্পষ্ট হয় যে ওয়েলস কেবল একটি সীমান্তভূমি ছিল না, বরং ব্রিটানিয়া প্রদেশের কেন্দ্রীয় রোমান সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত ছিল।
মূল ভিলার দক্ষিণ-পূর্বে আরও একটি বড় স্তম্ভযুক্ত কাঠামোর চিহ্ন পাওয়া গেছে। এটি হয় বড় কৃষি গুদাম, নয়তো পরবর্তী সময়ের কোনো সভাকক্ষ হতে পারে, যেখানে রোমান-পরবর্তী নেতারা ও তাদের অনুসারীরা সমবেত হতেন।

ভবিষ্যৎ রহস্য ও সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ
গবেষকদের আগ্রহের বড় বিষয় হলো, এই বসতি কি চতুর্থ শতকের শেষদিকে অন্যান্য রোমান ভিলার মতো ধ্বংস হয়ে যায়, নাকি পঞ্চম শতক পর্যন্ত টিকে ছিল। এমনকি এটি খ্রিষ্টধর্মের কোনো কেন্দ্রেও পরিণত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কবে খনন শুরু হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। আপাতত গবেষণা এলাকার পরিধি বাড়িয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করতে চান গবেষকেরা। অবৈধ ধাতু অনুসন্ধানকারীদের ঝুঁকি এড়াতে ভিলার সঠিক অবস্থান গোপন রাখা হয়েছে। তাই শতাব্দীর পর শতাব্দী যেমন নীরবে মাটির নিচে ছিল, আপাতত তেমনই অক্ষত থাকবে এই রোমান বিস্ময়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















