আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে একদিকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি চললেও অন্যদিকে সহিংসতা, হত্যা, বিস্ফোরণ ও মব ভায়োলেন্সের ঘটনায় জনমনে বাড়ছে গভীর উদ্বেগ। নির্বাচন কমিশন বলছে, রাজনৈতিক দলগুলো মোটামুটি আচরণবিধি মানছে। তবে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সহিংস ঘটনার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
নির্বাচনী প্রস্তুতির মাঝপথে উদ্বেগ
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মনোনয়ন যাচাই-বাছাই ও আপিল প্রক্রিয়া এখনো চলমান। জানুয়ারির শেষ দিকে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হওয়ার কথা। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই একাধিক রাজনৈতিক হত্যা ও সহিংস ঘটনায় নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
তফসিল ঘোষণার পরদিনই ইনকিলাব মঞ্চের এক নেতার হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে নাড়িয়ে দেয়। এরপর বিভিন্ন এলাকায় দলীয় কোন্দল, বিচ্ছিন্ন সহিংসতা এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন কমিশন আশাবাদী হলেও স্বীকার করছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি জরুরি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আশ্বাস ও বাস্তব চিত্র
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং বড় ধরনের শঙ্কার কারণ নেই। সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক নেতাদের জন্য অস্ত্রের লাইসেন্স ও সশস্ত্র নিরাপত্তার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণাসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে।
তবে বাস্তবে সহিংসতার ঘটনা থামেনি। রাজধানী ও বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী এমনকি সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কোথাও গুলিতে হত্যা, কোথাও হাতবোমা বিস্ফোরণ, আবার কোথাও মব ভায়োলেন্সের মতো নৃশংস ঘটনা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে হামলা
একাধিক ঘটনায় সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার পরিসংখ্যান
মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে শত শত রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। এসব ঘটনার বড় অংশের বিচার ও অস্ত্র উদ্ধার এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
উদ্ধার না হওয়া অস্ত্র বড় ঝুঁকি
গত বছরের অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। কিছু অস্ত্র উদ্ধার হলেও বড় অংশ এখনো বাইরে রয়ে গেছে, যা নির্বাচনকালীন সহিংসতার বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ কারণে নির্বাচন স্থগিতের দাবিতে আদালতেও আবেদন হয়েছে।

বিরোধী দলের উদ্বেগ
বিরোধী দলের নেতারা প্রকাশ্যে নিরাপত্তাহীনতার কথা বলছেন। কেউ কেউ নির্বাচনী প্রচারে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ব্যবহারের ঘোষণাও দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধ দমনে সরকারের ব্যর্থতার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
চার সপ্তাহে কতটা বদল সম্ভব
সাবেক পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, অল্প সময়ে বড় পরিবর্তন কঠিন হলেও জনবল বাড়ানো, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে জোর দেওয়া এবং কঠোর নজরদারি চালালে কিছুটা উন্নতি সম্ভব। তবে পুরোপুরি ঝুঁকি দূর হবে না বলেও তারা সতর্ক করছেন।

নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা পরিকল্পনা
নির্বাচনের আগে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে নিয়ে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে তারা কাজ করবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে একাধিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের কঠোরভাবে দমন করা হবে এবং কেউ নির্বাচন বানচাল করতে পারবে না।

আচরণবিধি নিয়ে স্বস্তি ও অস্বস্তি
নির্বাচনী প্রচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু না হলেও অনেক প্রার্থী ইতোমধ্যে শোভাযাত্রা ও প্রচারণায় নেমেছেন। তফসিল ঘোষণার পর আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব বেশি চোখে পড়েনি।
নির্বাচন কমিশন বলছে, পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো এবং আরও উন্নতির আশা রয়েছে। নিয়মিত সমন্বয় সভা, নজরদারি টিম ও ভিজিল্যান্স ব্যবস্থার কথা জানানো হয়েছে।
তবে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার কমিশনের এক সদস্যের মতে, তফসিল ঘোষণার পর থেকেই নির্বাচন কমিশনের আরও কঠোর ও দৃশ্যমান ভূমিকা প্রয়োজন ছিল। কমিশনের শক্ত বার্তা ও সক্রিয় উপস্থিতি না থাকায় ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

সমান সুযোগ ও মাঠের দাবি
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে প্রত্যেক প্রার্থী জিততে মরিয়া থাকেন। সে কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত সমন্বয় সভা এবং সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকৃত অর্থে সমতল মাঠ নিশ্চিত না হলে নির্বাচন নিয়ে জনআস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















