ভারত আজ এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। সীমিত প্রতিরক্ষা বাজেট, অসম্পূর্ণ সংস্কার এবং বিদেশি অস্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে আগের মতো চলতে থাকলে ভবিষ্যতে তার মূল্য দিতে হতে পারে। অন্যদিকে, বাস্তব হুমকি ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার সুযোগও রয়েছে। কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, সেটিই নির্ধারণ করবে ভারত নিজের কৌশলগত পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করবে নাকি অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হবে। প্রশ্নটি আর এই নয় যে ভারত প্রতিরক্ষা খাতে বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে কি না। আসল প্রশ্ন হলো, না করলে তার পরিণতি কতটা গুরুতর হবে। আধুনিক বিশ্বে শক্তিই ফল নির্ধারণ করে, প্রযুক্তিই যুদ্ধের রূপ বদলে দেয়। অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ সেই বাস্তবতাকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। এখন দেখার বিষয়, ভারত সেই সতর্কবার্তা কতটা গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করে।

ভেনেজুয়েলা অভিযান এবং আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা
২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র যখন অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ পরিচালনা করে ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং নিখুঁত অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে, তখন এটি শুধু একটি সামরিক আক্রমণ ছিল না। এটি ছিল গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়, যৌথ বাহিনীর কার্যকর ব্যবহার, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং কৌশলগত ধৈর্যের এক অনন্য উদাহরণ। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা ভারতের জন্য এই অভিযান একই সঙ্গে অনুপ্রেরণা ও সতর্ক সংকেত।
এই অভিযানে পশ্চিম গোলার্ধের ২০টি ঘাঁটি থেকে দেড় শতাধিক বিমান অংশ নেয়। বিশেষ বাহিনী ও বিশেষ বিমান রেজিমেন্টের সদস্যরা সরাসরি অভিযানে যুক্ত ছিলেন। সিআইএ, এনএসএ ও এনজিএ মাসের পর মাস ধরে তথ্য সংগ্রহ করে একটি পূর্ণাঙ্গ গোয়েন্দা চিত্র তৈরি করে। ডিসেম্বর ২০২৫ সালেই অভিযান চালানোর প্রস্তুতি থাকলেও উপযুক্ত আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা হয়। শেষ পর্যন্ত ভোরের অন্ধকারে অভিযান শুরু হলে ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, সাইবার ও ইলেকট্রনিক আক্রমণে রাজধানী কারাকাস অন্ধকারে ডুবে যায় এবং মূল বাহিনী নির্ভুলভাবে মিশন সম্পন্ন করে।
এই অভিযান দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনের চেয়েও প্রস্তুতি, আত্মনির্ভরতা এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ
ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও চ্যালেঞ্জ কোনো অংশে কম নয়। দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ, যাদের একটি বারবার আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়েছে। আরব সাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সামুদ্রিক স্বার্থ। অভ্যন্তরীণ ও সীমান্তবর্তী এলাকায় অরাষ্ট্রিক শক্তির সক্রিয়তা। পাশাপাশি সাইবার, মহাকাশ ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মতো নতুন যুদ্ধক্ষেত্রও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
২০১৯ সালের বালাকোট অভিযান ভারতের দৃঢ় সিদ্ধান্তের প্রমাণ দিয়েছে, ২০২০ সালের গালওয়ান পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে দৃঢ়তা। তবে দৃঢ়তা ও সক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক। বাস্তবতা হলো, জিডিপির অনুপাতে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যয় ধারাবাহিকভাবে কমেছে। একসময় আড়াই শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও বর্তমানে তা প্রায় দুই শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতিরক্ষা ব্যয় ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ভারতের তুলনায় অনেক বেশি। এই ব্যবধান দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগজনক।

আত্মনির্ভরতার গুরুত্ব
অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ প্রমাণ করেছে, আধুনিক যুদ্ধে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বই মূল চাবিকাঠি। স্যাটেলাইট নজরদারি, স্টেলথ সক্ষমতা, ইলেকট্রনিক আক্রমণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া, তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময় এবং নিখুঁত অস্ত্র ব্যবহারের সমন্বয়েই যুক্তরাষ্ট্র সফল হয়েছে। সেনার সংখ্যা নয়, ব্যবস্থার মানই এখানে নির্ধারক ছিল।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক। এই আমদানিনির্ভরতা অপারেশনাল স্বাধীনতা সীমিত করে, বিপুল অর্থ বিদেশে নিয়ে যায় এবং দেশীয় উদ্ভাবনের গতি কমিয়ে দেয়। আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। যে দেশ নিজের অস্ত্র নিজে তৈরি করতে পারে না, সে দেশ সংকটের সময় পুরোপুরি স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
সমন্বয় ও প্রযুক্তিতে ঘাটতি
এই অভিযানের সাফল্যের পেছনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গভীর সমন্বয়, যৌথ বাহিনীর নিখুঁত সমন্বয় এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বড় ভূমিকা রেখেছে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্ষমতা থাকলেও তথ্য বিনিময় ও সমন্বয়ে এখনও ঘাটতি রয়েছে। যৌথ বাহিনী কাঠামোর উদ্যোগ চলমান, কিন্তু পূর্ণ বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ। প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও অগ্রগতি সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতা রয়ে গেছে।

অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ
প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো নিয়ে প্রায়ই সামাজিক খাতের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কিন্তু নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। সঠিকভাবে পরিচালিত প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ায় এবং অর্থনীতিতে বহুগুণ প্রভাব ফেলে। ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির অন্তত তিন শতাংশে উন্নীত করা এবং এর বড় অংশ দেশীয় গবেষণা ও উৎপাদনে বিনিয়োগ করা এখন সময়ের দাবি।
ভেনেজুয়েলা অভিযান কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ফল নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা সক্ষমতা, সুস্পষ্ট কৌশল এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগের প্রতিফলন। এই অভিযান ভারতের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা বহন করে। আধুনিক বিশ্বে সক্ষমতাই বিকল্পের সুযোগ তৈরি করে। প্রশ্ন একটাই, ভারত কি সেই বাস্তবতা মেনে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















