উনিশ শতকের শেষভাগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নেওয়া জার্মান প্রজাতন্ত্রের পথচলা শুরু হয়েছিল এক ঐতিহাসিক প্রত্যাশা নিয়ে। রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি গড়তে জার্মান নেতারা খুঁজছিলেন একটি নিরাপদ ও প্রতীকী শহর। সেই খোঁজ গিয়ে থামে ছোট শহর ভাইমারে। উনিশশো উনিশ সালে এখানেই প্রণীত হয় জার্মানির সংবিধান, যা এক দশকেরও বেশি সময় দেশটির পথনির্দেশক ছিল। কিন্তু উনিশশো তেত্রিশ সালে সেই সংবিধানই ভেঙে দেন আদলফ হিটলার। ইতিহাসে এই সময়টাই পরিচিত হয়ে ওঠে ভাইমার প্রজাতন্ত্র নামে।
আজ ভাইমার শহরের কেন্দ্রে জাতীয় থিয়েটারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভাইমার প্রজাতন্ত্র জাদুঘর শুধু অতীত স্মরণ করায় না, বরং বর্তমান রাজনীতির জন্যও এক গভীর সতর্কবার্তা তুলে ধরে। ইতিহাসবিদদের মতে, ভাইমারের পতন কেবল জার্মানির গল্প নয়, বরং যে কোনো ভঙ্গুর গণতন্ত্রের জন্যই প্রাসঙ্গিক।

ভাইমারের অভিজ্ঞতা কেন আজও গুরুত্বপূর্ণ
জাদুঘরের সভাপতি ও রাজনীতি বিশ্লেষক মিখাইল ড্রেয়ারের মতে, বর্তমান সময়ে এই ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে কারণ ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে চরম ডানপন্থার উত্থান গণতন্ত্রকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। জার্মানিতেও এমন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান মানুষকে ভাবতে বাধ্য করছে, দেশটি আবার কি ভাইমারের পথে হাঁটছে না।
ভাইমারের সাধারণ বাসিন্দারাও মনে করেন, এই সময়কে বোঝা জরুরি। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, মানুষ কেন তখন নাৎসি দল ও হিটলারকে ভোট দিয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ভাইমারের ইতিহাস জানা প্রয়োজন।
আমেরিকান রাজনীতিতেও ভাইমারের ছায়া
ভাইমার প্রজাতন্ত্রের উদাহরণ শুধু জার্মান রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্রেও এই নামটি রাজনৈতিক বিতর্কে বারবার উঠে আসছে। অনেক বিশ্লেষক আধুনিক গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের তুলনা টানতে ভাইমারের দৃষ্টান্ত দেন। আবার রক্ষণশীল মহলের কেউ কেউ এই ইতিহাস ব্যবহার করেন বামপন্থী সহিংসতার আশঙ্কা তুলে ধরতে। ফলে ভাইমার আজ এক ধরনের রাজনৈতিক রূপক হয়ে উঠেছে।

ইতিহাসের ব্যাখ্যায় বড় পরিবর্তন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, ভাইমার প্রজাতন্ত্র শুরু থেকেই ব্যর্থ ছিল এবং তার সংবিধানেই লুকিয়ে ছিল পতনের বীজ। সেই ব্যাখ্যায় নাৎসিবাদকে অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। ইতিহাসবিদ ভলকার উলরিখের গবেষণা বলছে, ভাইমারের পতন পূর্বনির্ধারিত ছিল না। বরং গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির সচেতন ষড়যন্ত্র এবং উদারপন্থীদের দুর্বল প্রতিরোধই এর মূল কারণ।
ভাইমারের সংবিধান ছিল তৎকালীন সময়ে প্রগতিশীল। সর্বজনীন ভোটাধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং চরমপন্থী দল নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থাও সেখানে ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, এই কাঠামো বহু সংকট মোকাবিলা করতে পেরেছিল।
অর্থনৈতিক সংকট নয়, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র
উনিশশো ঊনত্রিশ সালের মহামন্দা ভাইমার প্রজাতন্ত্র কে দুর্বল করেছিল ঠিকই, তবে ইতিহাসবিদদের মতে সেটাই চূড়ান্ত পতনের কারণ নয়। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও রাষ্ট্রটি আরও কয়েক বছর টিকে ছিল। আসল বিপদ আসে যখন ডান ও চরম বামপন্থী শক্তি সামাজিক গণতন্ত্রীদের সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকার করে এবং সংসদ অচল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে প্রেসিডেন্ট পল ফন হিন্ডেনবুর্গ জরুরি ক্ষমতা বাড়াতে থাকেন। এর ফলেই পর্দার আড়ালে ক্ষমতার লড়াইয়ে হিটলারের উত্থান ঘটে।
বর্তমানের জন্য শিক্ষা
ভাইমার যুগেও ছিল বিভক্ত গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব এবং এমন এক রাজনৈতিক শ্রেণি যারা নিয়ম মেনে চললেও তাদের প্রতিপক্ষ তা মানত না। ইতিহাসবিদরা মনে করিয়ে দেন, আজকের গণতন্ত্রগুলো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। ভাইমারের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, গণতন্ত্র নিজে নিজে টিকে থাকে না। একে ভেতর থেকেই রক্ষা করতে হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















