গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহকে ইউরোপে অনেকেই অবাস্তব কল্পনা বলে ভাবলেও ওয়াশিংটনে এই চিন্তা মোটেও নতুন নয়। মার্কিন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভূখণ্ড দখল ও প্রভাব বিস্তারের ধারণা গভীরভাবে প্রোথিত। ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রমাণ করেছে দুর্বল প্রতিবেশীর জমি দখলের মাধ্যমে। যে প্রতিরোধ করতে পারে না, তার সীমান্ত নিরাপদ থাকে না—এই বাস্তবতা থেকেই আজ গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গ উঠে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ
ওয়াশিংটনের চোখে প্রশ্নটি আর ‘গ্রিনল্যান্ড নেওয়া হবে কি না’ নয়, বরং ‘কবে’ নেওয়া হবে। ডেনমার্ক সহ পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল লক্ষ্য হিসেবে দেখে। তাদের প্রতিক্রিয়া হবে নরম, এ বিশ্বাসই মার্কিন কৌশলগত চিন্তার ভিত্তি। ফলে শান্তিপূর্ণ চাপ কিংবা শক্তি প্রয়োগ—যে পথই হোক, গ্রিনল্যান্ডকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণে আনার ভাবনাকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলছে।
![]()
ইউরোপের আতঙ্ক আর নাটকীয় প্রতিক্রিয়া
সাম্প্রতিক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য, রাজনৈতিক উস্কানি ও আইন প্রণয়নের খসড়া ইউরোপে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। জার্মানির প্রস্তাবিত আর্কটিক নিরাপত্তা উদ্যোগ আসলে এক ধরনের প্রতীকী প্রতিক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই প্রস্তাবের বাস্তব গুরুত্ব কম, কারণ মূল বিষয় রাশিয়া বা চীনের হুমকি নয়, বরং ওয়াশিংটনের নিজস্ব অভিপ্রায়।
ন্যাটো প্রসঙ্গ ও বাস্তবতা
গ্রিনল্যান্ডকে ন্যাটোর ইস্যু বানানোর চেষ্টা জোটটিকে এক ধরনের মঞ্চ নাটকে পরিণত করছে। ইউরোপীয় রাজনীতিকরা হুমকির অভিনয় আর প্রতিক্রিয়ার অভিনয়ে অভ্যস্ত। কিন্তু গ্রিনল্যান্ডে সেই কৌশল কার্যকর হবে না। এই দ্বীপের ভূগোল, সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।
বিশ্বশক্তিগুলোর নির্লিপ্ত দৃষ্টি

রাশিয়া, চীন ও ভারতের চোখে গ্রিনল্যান্ড নাটক আসলে পশ্চিমা অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের আরেকটি উদাহরণ। রাশিয়ার জন্য এটি সরাসরি হুমকি নয়, কারণ আর্কটিকে মার্কিন উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। চীনের কাছেও গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা বড় বিষয় নয়; তাদের আগ্রহ মূলত উত্তরের সমুদ্রপথে।
ইউরোপীয় মর্যাদার অবসান
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়াটাই পশ্চিম ইউরোপের জন্য বড় আঘাত। দশকের পর দশক তারা নিজেদের বিশেষ মর্যাদার অংশ মনে করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হলেও সমান অংশীদার ভেবেছে। এখন সেই ভ্রম ভাঙছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের ভূখণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে পারে, তবে ইউরোপ আর আলাদা কিছু নয়—ওয়াশিংটনের চোখে তারা অন্য যেকোনো দুর্বল রাষ্ট্রের মতোই।
কেন গ্রিনল্যান্ড আসলে প্রতীক
গ্রিনল্যান্ড শুধু একটি দ্বীপ নয়, এটি ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্র দেখাতে চায়, তারা নিজের নিয়মে চলবে, আন্তর্জাতিক নিয়ম উপেক্ষা করতেও দ্বিধা করবে না। দুর্বল প্রতিবেশীর কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই আজ তাদের কাছে রাষ্ট্রের বৈধতার প্রমাণ।
এই কারণে গ্রিনল্যান্ডের প্রশ্ন আর্কটিকের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, যে ব্যবস্থার সুরক্ষায় ইউরোপ এতদিন ভরসা করেছিল, সেই ব্যবস্থাই এখন তাদের রক্ষা করছে না।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















