ইরানে চলমান বিক্ষোভে সরকার দমনে সক্ষম হলেও জনমনে জমে থাকা ক্ষোভ সহজে মিলিয়ে যাবে না—এমন আশঙ্কাই জোরালো হয়ে উঠেছে দেশি-বিদেশি বিশ্লেষকদের আলোচনায়। রাজধানী তেহরান সহ বিভিন্ন শহরের সাম্প্রতিক আন্দোলন ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বিস্তৃত ও সংঘাত মুখী প্রতিবাদের রূপ নিয়েছে।
বিক্ষোভকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছে সরকার
প্রায় পাঁচ দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা শাসকগোষ্ঠী এবং ছিয়াশি বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এই আন্দোলনকে সরাসরি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন। সেই উপলব্ধি থেকেই নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর শক্তি প্রয়োগে এগিয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ রক্ষায় সরকার আপসহীন অবস্থান নিয়েছে।
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগে পথে নামা মানুষ
ইরানের বহু নাগরিকের বিশ্বাস, ইসলামি বিপ্লবের প্রতিশ্রুত উন্নত জীবন বাস্তবে রূপ পায়নি। বরং দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনৈতিক দুরবস্থা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে কোণঠাসা করেছে। এই ক্ষোভ দেশজুড়ে হাজার হাজার মানুষকে রাজপথে নামিয়েছে, যেখানে অনেকেই শাসনের অবসান দাবি করছে।
সরকার টিকে যেতে পারে, ক্ষোভ থেকে যাবে
বিশ্লেষকদের মতে, এই দফায় সরকার আন্দোলন দমন করতে সক্ষম হলেও বিষয়টি চূড়ান্ত সমাধান নয়। গবেষণা সংস্থার এক বিশ্লেষক বলেছেন, সরকার মূল সমস্যার সমাধান না করে শুধু দমন-পীড়নের মাধ্যমে সময় কিনছে। ফলে রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে পরবর্তী সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠছে।

তথ্য অন্ধকার আর মৃত্যুর হিসাব
ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রকৃত পরিস্থিতি জানা কঠিন। তবে মানবাধিকার সংগঠন ও স্বাস্থ্য খাতের সূত্রে জানা যাচ্ছে, শত শত মানুষ নিহত হয়েছে, সংখ্যাটি আরও বেশি হতে পারে। এতে জনমনে ভয় ও ক্ষোভ একসঙ্গে বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও অনিশ্চয়তা
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বড় অজানা ভেরিয়েবল হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সামরিক পদক্ষেপ, সাইবার হামলা কিংবা নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না, যা তেহরানের জন্য কিছুটা স্বস্তির পথ খুলে দিতে পারে।
বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী ও ক্ষমতার কাঠামো
ইসলামি বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী সংবিধানগতভাবে শাসনব্যবস্থা, আদর্শ ও সর্বোচ্চ নেতার সুরক্ষায় দায়বদ্ধ। এই বাহিনী অর্থনীতি, তেল, প্রতিরক্ষা এবং অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রে তাদের প্রভাব প্রশ্নাতীত।
বিভক্ত বিরোধী শক্তি
বিরোধী শিবির এখনও ঐক্যবদ্ধ নয়। নির্বাসিত সাবেক শাহের পুত্র রেজা পাহলভি নিজেকে বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে তুলে ধরলেও, তার প্রতি সমর্থনের মাত্রা স্পষ্ট নয়। অতীতে যেমন একক নেতৃত্ব আন্দোলনকে শক্তি দিয়েছিল, এবার তেমন চিত্র অনুপস্থিত।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই আন্দোলনের জ্বালানি
মুদ্রার আকস্মিক পতন, কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও পানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। শুরুতে সরকার সমস্যার কথা শোনার আশ্বাস দিলেও তা কার্যকর না হওয়ায় দমননীতি বেছে নেয়।
বিপ্লবের ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার টিকে থাকলেও ইসলামি বিপ্লবের আদর্শিক আকর্ষণ ক্ষয়প্রাপ্ত। নতুন প্রজন্মের লক্ষ্য ভিন্ন, কঠোর ধর্মীয় নিয়মে তারা আর নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে না। ফলে ইরানে আপাত নীরবতার আড়ালে জমে থাকা ক্ষোভ ভবিষ্যতে আরও বড় বিস্ফোরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















