০৭:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬
আইসিইউ সংকটে আরও এক শিশুর মৃত্যু, মায়ের আহাজারিতে ভারী ময়মনসিংহ মেডিকেল প্রভাসের ‘স্পিরিট’ কি পিছিয়ে যাচ্ছে? অবশেষে মুখ খুললেন নির্মাতারা হাম পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ মৃত্যু মমতা-অভিষেকের নিরাপত্তা প্রত্যাহার নয়, শুধু অতিরিক্ত মোতায়েন কমানো হয়েছে: শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা পূর্বাঞ্চলের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা: ভারতের কূটনীতিতে কি খুলছে নতুন পথ? শীতলক্ষ্যায় তিনদিনের পুরোনো মরদেহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রসহ ঝড়ের আভাস: আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের দোকানে তরুণীর মরদেহ উদ্ধার এপ্রিলেই সড়কে ঝরল ৪০৪ প্রাণ, বাড়ছে নিরাপত্তা সংকট দীর্ঘ আড়াই মাস পর এক লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে দেশে পৌঁছাল জাহাজ, স্বস্তি ফিরছে ইআরএলে

শীতেও স্বস্তি নেই রান্নাঘরে

শীত এলেই সাধারণ মানুষের আশা থাকে রান্নাঘরের বাজার কিছুটা হলেও স্বস্তির হবে। মাঠে সবজি ওঠে, সরবরাহ বাড়ে, দাম নামবে—এই চেনা ধারণাই বহু বছরের। কিন্তু রাজধানীর কাঁচাবাজারে হাঁটলে সেই হিসাব মিলছে না। জানুয়ারির শুরু থেকেই সবজির দামে উল্টো ঊর্ধ্বগতি, যা সবচেয়ে বেশি চাপ ফেলছে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনে।

রাজধানীর রায়েরবাগ, শনির আখাড়া ও সেগুনবাগিচার বাজার ঘুরে দেখা যায়, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে একাধিক সবজির দাম। টমেটো, শিম, শালগম, বেগুন, লাউ—যেগুলো শীতের নিত্যসঙ্গী, সেগুলোর দামই এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

শনির আখাড়া বাজারে একটি লাউয়ের দাম ১০০ থেকে ১২০ টাকা। এক সপ্তাহ আগেও একই লাউ বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। শালগম ৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকা, শিম ৩০ টাকা থেকে উঠে গেছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। দেশি টমেটোর কেজি এখন ৯০ থেকে ১০০ টাকা। ফুলকপি, যেটি শীতের অন্যতম সস্তা সবজি হিসেবে পরিচিত, সেটিও এখন ৪০ টাকার নিচে নেই।

শীতের আগমনে স্বস্তি কুমিল্লার সবজির বাজারে, বেড়েছে আলুর দাম

দাম কেন বাড়ছে—এই প্রশ্নে বিক্রেতাদের উত্তর প্রায় এক। ঠান্ডায় ক্ষেতে কাজ কম, সরবরাহ কম, ট্রাক আসছে না। কিন্তু ক্রেতাদের চোখে এই ব্যাখ্যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। শনির আখাড়া বাজারে সবজি কিনতে এসে দাম শুনে ফিরে যান অনেকেই। কেউ কেউ ক্ষোভ চাপতে না পেরে প্রশ্ন তুলছেন, শীতের মধ্যেই যদি সবজি না আসে, তাহলে আসে কখন।

এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে যাদের আয় সীমিত। দিনমজুর, রিকশাচালক, গার্মেন্টস শ্রমিক কিংবা গৃহকর্মীর পরিবারে বাজার মানেই হিসাবের খাতা। আগে যেখানে ২০০ টাকায় তিন চার দিনের সবজি কেনা যেত, সেখানে এখন একই টাকায় একদিনের বাজারও হয় না। ফলে খাবারের তালিকা ছোট হচ্ছে, পুষ্টি কমছে।

অনেক পরিবারে এখন দিনে দুই বেলার বদলে এক বেলা রান্না হচ্ছে। কেউ কেউ সবজি বাদ দিয়ে ভাত আর আলু কিংবা ডালেই দিন কাটাচ্ছেন। মাছের দাম কিছুটা কমলেও সেটিও নিয়মিত কেনার মতো নয়। ডিম ডজনপ্রতি ১২০ টাকা, গরুর মাংস ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকা—এসব নিম্নআয়ের মানুষের জন্য প্রায় বিলাসে পরিণত হয়েছে।

মা হিসেবে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়ছেন গৃহিণীরা। শিশুদের পুষ্টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আগে সপ্তাহে দুই তিন দিন সবজি দিয়ে ভাত খাওয়ানো যেত, এখন সেটাও অনিশ্চিত। অনেকেই বলছেন, বাজারে গেলে হাত কাঁপে, কী নেব আর কী বাদ দেব—এই হিসাব করতে করতেই মন ভেঙে যায়।

চালের দাম কমলেও স্বস্তি নেই পেঁয়াজ ও সবজির বাজারে

বাজারে কিছু পণ্যের দাম স্থির থাকলেও সামগ্রিক চিত্র স্বস্তিদায়ক নয়। নতুন আলু কেজি ২৫ টাকা হলেও অন্যান্য সবজির দামের চাপে সেটিও খুব বেশি কাজে আসছে না। গাজরের দাম কিছুটা কমলেও সেটি সাময়িক স্বস্তি মাত্র। সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও সংকুচিত করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিবহন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য এবং বাজার তদারকির অভাব এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ। কিন্তু এসব ব্যাখ্যার ভার শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের কাঁধেই। আয় বাড়ছে না, কিন্তু প্রতিদিনের খরচ বাড়ছেই।

শীতের বাজার যেখানে স্বস্তির কথা, সেখানে এখন তা হয়ে উঠেছে নতুন দুশ্চিন্তার নাম। বাজারের থলে হালকা হচ্ছে, কিন্তু মানুষের উদ্বেগ ভারী হচ্ছে। রান্নাঘরের এই নীরব সংকটই আজ নিম্নআয়ের মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

জনপ্রিয় সংবাদ

আইসিইউ সংকটে আরও এক শিশুর মৃত্যু, মায়ের আহাজারিতে ভারী ময়মনসিংহ মেডিকেল

শীতেও স্বস্তি নেই রান্নাঘরে

০২:৪২:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

শীত এলেই সাধারণ মানুষের আশা থাকে রান্নাঘরের বাজার কিছুটা হলেও স্বস্তির হবে। মাঠে সবজি ওঠে, সরবরাহ বাড়ে, দাম নামবে—এই চেনা ধারণাই বহু বছরের। কিন্তু রাজধানীর কাঁচাবাজারে হাঁটলে সেই হিসাব মিলছে না। জানুয়ারির শুরু থেকেই সবজির দামে উল্টো ঊর্ধ্বগতি, যা সবচেয়ে বেশি চাপ ফেলছে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনে।

রাজধানীর রায়েরবাগ, শনির আখাড়া ও সেগুনবাগিচার বাজার ঘুরে দেখা যায়, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে একাধিক সবজির দাম। টমেটো, শিম, শালগম, বেগুন, লাউ—যেগুলো শীতের নিত্যসঙ্গী, সেগুলোর দামই এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

শনির আখাড়া বাজারে একটি লাউয়ের দাম ১০০ থেকে ১২০ টাকা। এক সপ্তাহ আগেও একই লাউ বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। শালগম ৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকা, শিম ৩০ টাকা থেকে উঠে গেছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। দেশি টমেটোর কেজি এখন ৯০ থেকে ১০০ টাকা। ফুলকপি, যেটি শীতের অন্যতম সস্তা সবজি হিসেবে পরিচিত, সেটিও এখন ৪০ টাকার নিচে নেই।

শীতের আগমনে স্বস্তি কুমিল্লার সবজির বাজারে, বেড়েছে আলুর দাম

দাম কেন বাড়ছে—এই প্রশ্নে বিক্রেতাদের উত্তর প্রায় এক। ঠান্ডায় ক্ষেতে কাজ কম, সরবরাহ কম, ট্রাক আসছে না। কিন্তু ক্রেতাদের চোখে এই ব্যাখ্যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। শনির আখাড়া বাজারে সবজি কিনতে এসে দাম শুনে ফিরে যান অনেকেই। কেউ কেউ ক্ষোভ চাপতে না পেরে প্রশ্ন তুলছেন, শীতের মধ্যেই যদি সবজি না আসে, তাহলে আসে কখন।

এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে যাদের আয় সীমিত। দিনমজুর, রিকশাচালক, গার্মেন্টস শ্রমিক কিংবা গৃহকর্মীর পরিবারে বাজার মানেই হিসাবের খাতা। আগে যেখানে ২০০ টাকায় তিন চার দিনের সবজি কেনা যেত, সেখানে এখন একই টাকায় একদিনের বাজারও হয় না। ফলে খাবারের তালিকা ছোট হচ্ছে, পুষ্টি কমছে।

অনেক পরিবারে এখন দিনে দুই বেলার বদলে এক বেলা রান্না হচ্ছে। কেউ কেউ সবজি বাদ দিয়ে ভাত আর আলু কিংবা ডালেই দিন কাটাচ্ছেন। মাছের দাম কিছুটা কমলেও সেটিও নিয়মিত কেনার মতো নয়। ডিম ডজনপ্রতি ১২০ টাকা, গরুর মাংস ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকা—এসব নিম্নআয়ের মানুষের জন্য প্রায় বিলাসে পরিণত হয়েছে।

মা হিসেবে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়ছেন গৃহিণীরা। শিশুদের পুষ্টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আগে সপ্তাহে দুই তিন দিন সবজি দিয়ে ভাত খাওয়ানো যেত, এখন সেটাও অনিশ্চিত। অনেকেই বলছেন, বাজারে গেলে হাত কাঁপে, কী নেব আর কী বাদ দেব—এই হিসাব করতে করতেই মন ভেঙে যায়।

চালের দাম কমলেও স্বস্তি নেই পেঁয়াজ ও সবজির বাজারে

বাজারে কিছু পণ্যের দাম স্থির থাকলেও সামগ্রিক চিত্র স্বস্তিদায়ক নয়। নতুন আলু কেজি ২৫ টাকা হলেও অন্যান্য সবজির দামের চাপে সেটিও খুব বেশি কাজে আসছে না। গাজরের দাম কিছুটা কমলেও সেটি সাময়িক স্বস্তি মাত্র। সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও সংকুচিত করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিবহন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য এবং বাজার তদারকির অভাব এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ। কিন্তু এসব ব্যাখ্যার ভার শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের কাঁধেই। আয় বাড়ছে না, কিন্তু প্রতিদিনের খরচ বাড়ছেই।

শীতের বাজার যেখানে স্বস্তির কথা, সেখানে এখন তা হয়ে উঠেছে নতুন দুশ্চিন্তার নাম। বাজারের থলে হালকা হচ্ছে, কিন্তু মানুষের উদ্বেগ ভারী হচ্ছে। রান্নাঘরের এই নীরব সংকটই আজ নিম্নআয়ের মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।