এশিয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত কঠিন হয়ে উঠছে—এই বাস্তবতার মধ্যেই জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টোকিও ও ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, দুই দেশের জোটে কোনো ধরনের টালমাটাল ভাব নেই, বরং চীনের বাড়তে থাকা চাপের মুখে এই অংশীদারত্ব আরও গভীর হচ্ছে।
ওয়াশিংটনে বৈঠক, প্রতিরক্ষায় নতুন সমঝোতা
শুক্রবার ওয়াশিংটনে জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি ও যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথের বৈঠকের পর এই বার্তা আসে। বৈঠকে দুই দেশ ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের যৌথ উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়। একই সঙ্গে জাপানের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমের জলসীমায় সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশ দ্রুত অবনতি হচ্ছে এবং এই প্রেক্ষাপটে জাপান-যুক্তরাষ্ট্র জোট সম্পূর্ণভাবে অটল রয়েছে। দুই মন্ত্রী আকাশ থেকে আকাশে এবং ভূমি থেকে আকাশে প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের যৌথ উৎপাদন আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানান।
দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল ও ওকিনাওয়ার কৌশলগত গুরুত্ব
বৈঠকে বিভিন্ন অঞ্চলে আরও উন্নত ও বাস্তবসম্মত যৌথ সামরিক মহড়া বাড়ানোর কথাও উঠে আসে। বিশেষ করে জাপানের তথাকথিত দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল, যার মধ্যে উপক্রান্তীয় দ্বীপ ওকিনাওয়া রয়েছে, সেখানে প্রতিরক্ষা জোরদার করা টোকিওর অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
ওকিনাওয়ায় জাপানে অবস্থিত অধিকাংশ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এই অঞ্চল থেকেই চীন, তাইওয়ান প্রণালি ও কোরীয় উপদ্বীপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। টোকিও ও ওয়াশিংটন উভয়েই ওকিনাওয়ার কৌশলগত গুরুত্ব বারবার তুলে ধরছে।
চীন-জাপান কূটনৈতিক টানাপোড়েন
এরই মধ্যে জাপান ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনাও তীব্র হয়েছে। গত নভেম্বরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ইঙ্গিত দেন, চীন যদি তাইওয়ানে হামলা চালায়, তবে জাপান সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে। বেইজিং এতে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।
![]()
চীন তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ড বলে দাবি করে এবং জাপানের বক্তব্যের জবাবে সামরিক ব্যবহারের সম্ভাবনা আছে—এমন কিছু পণ্যের রপ্তানি জাপানে বন্ধ করে দেয়। এতে টোকিওতে আশঙ্কা বাড়ে, চীন গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ সরবরাহেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
সামরিক বাজেট বাড়াচ্ছে টোকিও
এই উত্তেজনার মধ্যেই জাপান ধারাবাহিকভাবে সামরিক বাজেট বাড়াচ্ছে। গত ডিসেম্বরে তাকাইচি সরকারের ডানপন্থী প্রশাসন আগামী অর্থবছরের জন্য রেকর্ড নয় ট্রিলিয়ন ইয়েন প্রতিরক্ষা ব্যয়ের অনুমোদন দেয়।
কোইজুমির সঙ্গে বৈঠকের শুরুতেই হেগসেথ এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। তিনি জাপানের পদক্ষেপকে বাস্তববাদী ও যৌক্তিক বলে উল্লেখ করেন, যা দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থকে একত্র করেছে বলে মন্তব্য করেন।
কূটনীতির বাইরে ব্যক্তিগত মুহূর্ত
এই বৈঠকের আগে কোইজুমি ও হেগসেথ একসঙ্গে একটি সামরিক জিমে সকালের কসরতেও অংশ নেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোইজুমি লেখেন, মার্কিন সামরিক ধাঁচের প্রশিক্ষণ খুবই কঠিন ছিল, তবে জাপান-যুক্তরাষ্ট্র জোট শক্তিশালী করার জন্য তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।

পূর্ব চীন সাগরে নতুন উত্তেজনা
এদিকে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চীন ও জাপানের মধ্যবর্তী পূর্ব চীন সাগরে চীন একটি নতুন প্রাকৃতিক সম্পদ উন্নয়ন কাঠামো নির্মাণ শুরু করেছে। টোকিও একে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে উল্লেখ করে বেইজিংয়ের কাছে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বিতর্কিত এই জলসীমায় চীনের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
দক্ষিণ চীন সাগরেও উত্তাপ
অন্যদিকে দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যেও টানাপোড়েন চলছে। ম্যানিলায় চীনা দূতাবাস ফিলিপাইন কোস্ট গার্ডের এক মুখপাত্রের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। ওই পোস্টে চীনা প্রেসিডেন্টের ব্যঙ্গাত্মক ছবি ব্যবহারের অভিযোগ তোলে বেইজিং।
চীন দাবি করছে, এই পদক্ষেপ তাদের রাজনৈতিক মর্যাদার গুরুতর লঙ্ঘন এবং এটি একটি প্রকাশ্য রাজনৈতিক উসকানি, যা লাল রেখা অতিক্রম করেছে।
মূল কথা, এশিয়ার সামরিক ও কূটনৈতিক মানচিত্রে একের পর এক উত্তেজনা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—চাপ যতই বাড়ুক, তাদের প্রতিরক্ষা জোট আরও দৃঢ় ও সক্রিয় হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















