দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের অপেক্ষার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও দক্ষিণ আমেরিকার আঞ্চলিক জোট মারকোসুর অবশেষে একটি ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তির পথে এগিয়ে গেল। পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই চুক্তি শুধু অর্থনীতির নয়, ইউরোপের নতুন কূটনৈতিক ও ক্ষমতার রাজনীতির দিক নির্দেশনা ও স্পষ্ট করে তুলেছে।
দীর্ঘ আলোচনার অবসান
১৯৯০–এর দশকের শেষ দিকে যখন এই চুক্তির আলোচনা শুরু হয়, তখন বিশ্বায়নের জোয়ার ছিল তুঙ্গে। ইউরোপ তখন একক মুদ্রা চালুর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, আর বিশ্ব অর্থনীতি ছিল তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত। কিন্তু ইউরোপীয় কৃষকদের আপত্তি, বিশেষ করে সস্তা গরুর মাংস ও চিনির আশঙ্কা, বছরের পর বছর এই চুক্তিকে আটকে রাখে। ফ্রান্সের নেতৃত্বে একাধিক দেশ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপত্তি জানালেও জনসংখ্যাভিত্তিক ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পেয়ে যায় চুক্তিটি।

বিশ্ব রাজনীতির চাপ ও নতুন সমীকরণ
বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বায়ন থেকে সরে এসে শুল্ক বাড়াচ্ছে, আর চীন গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব বাড়াচ্ছে। এই বাস্তবতায় ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকা নিজেদের অভিন্ন চ্যালেঞ্জ বুঝতে পেরে একে অপরের দিকে ঝুঁকেছে। প্যারাগুয়েতে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের মাধ্যমে সেই পরিবর্তিত মনোভাবই প্রকাশ পেতে চলেছে।
অর্থনীতির চেয়ে বড় কৌশল
এই চুক্তিতে কৃষিপণ্যের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিত। ইউরোপ থেকে মারকোসুর দেশগুলোতে রপ্তানিকৃত মদের মূল্য ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনীতির খুবই ক্ষুদ্র অংশ। গরুর মাংস আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের পরিমাণ সীমিত রাখা হয়েছে, যাতে ইউরোপীয় বাজারে দামের বড় ধরনের পরিবর্তন না আসে। মূল লক্ষ্য হলো সাতশো মিলিয়নের বেশি মানুষের একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলা।

ভবিষ্যতের লাভ ও ইউরোপের পথচলা
ইউরোপীয় হিসাব অনুযায়ী, দুই পক্ষের প্রায় নব্বই শতাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার হলে আগামী দুই দশকে ইউরোপের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। যদিও এই অঙ্ক ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনীতির তুলনায় বড় নয়, তবু মার্কিন সুরক্ষাবাদ ও চীনা প্রতিযোগিতার মুখে ইউরোপীয় শিল্পের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। একই সঙ্গে লাতিন আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে ইউরোপ বিকল্প কাঁচামাল ও শিল্প ভিত্তি গড়ে তুলতে চাইছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রিক সম্পর্কের বাইরে গিয়ে ইউরোপের নিজস্ব ক্ষমতার রাজনীতির সূচনা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















