ইরানে সম্ভাব্য সামরিক হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাবনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তারই প্রভাবশালী আরব উপসাগরীয় মিত্ররা। তাদের আশঙ্কা, এমন হামলা গোটা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার ঢেউ তুলবে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক অবস্থানকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
ইরানে চলমান বিক্ষোভ ও সরকারের কঠোর দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসন দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে চাপ দিতেই এই বিকল্প ভাবা হচ্ছে। পাশাপাশি কূটনৈতিক পথও খোলা রাখার কথা বলেন তিনি। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ইরানে সহিংসতা কমেছে বা বন্ধ হয়েছে বলেও তাকে জানানো হয়েছে।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো, এমনকি ইরানের সঙ্গে পরোক্ষ সংঘাতে জড়ানো দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পক্ষে নয়। বিশ্লেষকদের মতে, এর মূল কারণ হলো সম্ভাব্য সংঘাতের প্রতিক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে বা ইরানে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর। তারা নিজেদের দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও পর্যটনের নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেছে, যা এই অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ ছাড়া উপসাগরীয় অনেক সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে। তাদের কেউ কেউ এখন মনে করছে, ইরানের চিরশত্রু ইসরায়েলই মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে বেশি আগ্রাসী ভূমিকা নিচ্ছে। তাদের মতে, দুর্বল ইরানের চেয়ে ইসরায়েলের একক আধিপত্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক বদর আল সাইফ বলেন, ইরানে বোমা হামলা আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের সঙ্গে যায় না। তার মতে, ইরানে সরকার পরিবর্তন বা নেতৃত্বের বড় রদবদল হলে ইসরায়েলের অভূতপূর্ব আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ক্ষতিকর হবে।

মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকা ওমান ইতিমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানে হামলা না করার পরামর্শ দিয়েছে বলে জানা গেছে। একইভাবে কাতারও পরিস্থিতি শান্ত রাখতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি বলেন, অঞ্চলের বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবাইকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তোলে। তবে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দেয়নি ওয়াশিংটন। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, ট্রাম্প ইরানের সাহসী জনগণের পাশে আছেন এবং হত্যাযজ্ঞ বন্ধে সব বিকল্পই খোলা রয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর ভয় অমূলক নয়। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর প্রতিশোধ হিসেবে কাতারে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা হয়। এই ঘটনার পর সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে কাতারের ওই ঘাঁটি থেকে অপ্রয়োজনীয় মার্কিন কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ভূমিকার দিকেও নজর দিচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলো। গত বছর কাতারে ইসরায়েলের একটি হামলা, যেখানে হামাস নেতাদের হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল, অঞ্চলজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এতে স্পষ্ট হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইসরায়েলের পদক্ষেপও তাদের নিরাপত্তা হিসাবকে জটিল করে তুলছে। এই ঘটনার পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি করেন, যা নতুন কৌশলগত সমীকরণের ইঙ্গিত দেয়।

উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ছয় দেশ ইরানের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্ক বজায় রাখে। কুয়েত, ওমান ও কাতারের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব ও বাহরাইনের অবস্থান বেশি বৈরী। অতীতে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো সৌদি আরব ও আমিরাতে হামলা চালিয়েছে। তবু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি নেতৃত্ব আঞ্চলিক উত্তেজনা কমিয়ে ঘরোয়া অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় মনোযোগ দিতে চায়। এরই অংশ হিসেবে ২০২৩ সালে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে রিয়াদ।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান আরও জটিল। একদিকে তারা তেহরানের হুমকি নিয়ে সতর্ক, অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। তবু ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে দুবাই, যা দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আমিরাতের বাণিজ্যমন্ত্রী থানি আল জায়ুদি বলেন, ইরান তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং খাদ্যসহ অনেক পণ্যের প্রধান সরবরাহকারী।
সব মিলিয়ে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো মনে করছে, ইরানে বোমা হামলা সমস্যার সমাধান নয়। বরং কূটনীতি ও সংলাপই এই সংকট মোকাবিলার একমাত্র নিরাপদ পথ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















