শীতের তীব্রতা বাড়তেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে নেমে এসেছে নীরব বিপর্যয়। রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ ভেঙে পড়ায় হাজারো পরিবার ঠান্ডায় কাঁপছে। বছরের সবচেয়ে কঠিন শীতের মধ্যে পড়ে শহরটি এখন কার্যত উন্মুক্ত, ঘরবাড়ি তাপহীন, আলোহীন।
জরুরি সেবার তাবুতে আশ্রয়
টানা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার পর কিয়েভের বিভিন্ন এলাকায় জরুরি সেবার পক্ষ থেকে অস্থায়ী তাবু খোলা হয়েছে। এসব তাবুতে বিদ্যুৎ ও তাপের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে মানুষ অন্তত কিছু সময় উষ্ণ থাকতে পারে। শহরের সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে পানির পাম্প, পাতাল রেল ও হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবায়।

ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য পরিবার
ইউলিয়া মিখাইলিউক ও ইহোর হনচারুক যুদ্ধের পুরো সময় কিয়েভেই ছিলেন। ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা শহর ছাড়েননি। কিন্তু এই সপ্তাহে পরিস্থিতি বদলে যায়। তাপমাত্রা নেমে যায় হিমাঙ্কের অনেক নিচে। ঘরের ভেতরেই নিঃশ্বাসের ধোঁয়া দেখা যাচ্ছিল। এক বছরের শিশুপুত্রকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত তারা আত্মীয়ের বাড়িতে চলে যেতে বাধ্য হন। ইউলিয়ার কথায়, এটি আর অস্বস্তি নয়, এর চেয়েও ভয়াবহ।
শীতকে অস্ত্র বানানোর কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া এবার পরিকল্পিতভাবে কিয়েভের তাপ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করছে। উদ্দেশ্য মানুষের মনোবল ভাঙা এবং সরকারকে শান্তি আলোচনায় চাপের মুখে ফেলা। অতীতে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ভাঙার চেষ্টা ব্যর্থ হলেও এবার লক্ষ্য নির্দিষ্ট কয়েকটি শহর, যার মধ্যে কিয়েভ অন্যতম।

বিদ্যুৎ প্রায় অচল
সাম্প্রতিক হামলায় কিয়েভের আশপাশের ট্রান্সফরমার কেন্দ্র ধ্বংস হওয়ায় শহরটি দেশের অন্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণ সময়ে যেখানে শহরের প্রয়োজন ছিল প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট, সেখানে এখন তার দশ ভাগের এক ভাগেরও কম বিদ্যুৎ দিয়ে কোনমতে চলছে জরুরি সেবা।
মেরামতের মাঝেই হামলা
জ্বালানি গবেষণা বিশেষজ্ঞ ওলেকসান্দর খারচেঙ্কোর ভাষায়, মেরামতের কাজ চলার সময়ই হামলা করা হচ্ছে। এতে আহত ও নিহত হচ্ছেন বহু জ্বালানি কর্মী। বারবার আঘাতে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক টানাপোড়েন
এই সংকট রাজনৈতিক উত্তেজনাও বাড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও মেয়র ভিতালি ক্লিচকোর মধ্যে দোষারোপ শুরু হয়েছে। মেয়র নাগরিকদের সাময়িকভাবে অন্য শহরে আত্মীয়দের কাছে যাওয়ার অনুরোধ জানালেও পূর্ণাঙ্গ সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেননি।
মানুষের ক্লান্তি ও দ্বিধা
শহরের একাধিক এলাকায় ভাঙা কাচ পরিষ্কার করতে দেখা যাচ্ছে বাসিন্দাদের। প্রতিদিনের এই দৃশ্য মানুষকে ক্লান্ত করে তুলছে। অনেকেই যুদ্ধ বন্ধের কথা বলছেন, কেউ কেউ বড় ত্যাগ স্বীকারের কথাও তুলছেন। আবার কেউ মনে করেন, এতে আগ্রাসন আরও বাড়বে।

শেষ না হওয়া শীত
ইউলিয়া মিখাইলিউকের বিশ্বাস, শান্তির কথা যতই শোনা যাক, বাস্তবতা ভিন্ন। পরিস্থিতি ভালো হচ্ছে না, বরং আরও কঠিন হয়ে উঠছে। কিয়েভে এই শীত শুধু আবহাওয়ার নয়, টিকে থাকারও পরীক্ষা।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















