চীনের একটি হাসপাতালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এমন এক প্রযুক্তির পরীক্ষা চলছে, যা উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই একাধিক রোগীর জীবন বাঁচিয়েছে এবং ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
উপসর্গ ছাড়াই ধরা পড়া মারণরোগ
পূর্ব চীনের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত ইটভাটার শ্রমিক চিউ সিজুন নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষার অংশ হিসেবে একটি সিটি স্ক্যান করিয়েছিলেন। তিন দিন পর অচেনা এক চিকিৎসকের ফোন পেয়ে তিনি বুঝেছিলেন, বিষয়টি ভালো কিছু নয়। পরীক্ষায় ধরা পড়ে, তার অগ্ন্যাশয়ে ক্যান্সার হয়েছে। তবে আশার কথা, ক্যান্সারটি ছিল একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে। দ্রুত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমারটি সরিয়ে ফেলেন চিকিৎসক ঝু কেলেই।
চিউ সিজুনের ক্ষেত্রে এই আগাম শনাক্তকরণ সম্ভব হয়েছে কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি নতুন যন্ত্রের কারণে, যা তার সিটি স্ক্যানে ঝুঁকির ইঙ্গিত দিয়েছিল, যদিও তখনো তার শরীরে কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি।

অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার ও শনাক্তকরণের সংকট
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ক্যান্সার গুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। পাঁচ বছরের বেঁচে থাকার হার মাত্র প্রায় দশ শতাংশ। মূল কারণ হলো, এই ক্যানসার খুব দেরিতে ধরা পড়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগ অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার পর উপসর্গ দেখা দেয়।
সাধারণভাবে ক্যান্সার শনাক্তে যে কনট্রাস্ট সিটি স্ক্যান ব্যবহার করা হয়, তাতে বিকিরণের মাত্রা বেশি। সে কারণে ব্যাপক স্ক্রিনিংয়ে চিকিৎসকেরা অনীহা দেখান। অন্যদিকে কম বিকিরণের নন কনট্রাস্ট সিটি স্ক্যানে ছবি তুলনামূলক অস্পষ্ট হয়, ফলে অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন সমাধান
এই জটিলতা কাটিয়ে উঠতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগানো হয়েছে। চীনের একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের তৈরি এই যন্ত্রটি নন কনট্রাস্ট সিটি স্ক্যান বিশ্লেষণ করে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের সম্ভাব্য চিহ্ন শনাক্ত করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এটিকে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার শুরু করে দুই হাজার চব্বিশ সালের নভেম্বর মাসে।

এখন পর্যন্ত এই যন্ত্র এক লক্ষ আশি হাজারের বেশি পেট ও বক্ষদেশের সিটি স্ক্যান বিশ্লেষণ করেছে। এর মাধ্যমে প্রায় দুই ডজন ক্যানসারের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে চৌদ্দটি ছিল একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের। অধিকাংশ রোগীই প্রথমে সাধারণ উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন এবং তাদের স্ক্যানে প্রাথমিকভাবে কোনো বিপদের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সতর্ক সংকেত পাওয়ার পরই চিকিৎসকেরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন।
চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা
চিকিৎসক ঝু কেলেইয়ের ভাষায়, অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রোগীদের জীবন বাঁচিয়েছে। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন, এই প্রযুক্তি এখনো অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিকল্প নয়। কখনো কখনো এটি অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহকেও ক্যানসার হিসেবে চিহ্নিত করে এবং টিউমারটি অগ্ন্যাশয় থেকেই উৎপত্তি হয়েছে নাকি অন্য অঙ্গ থেকে ছড়িয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না।
যন্ত্রটি চালুর পর প্রায় এক হাজার চারশ স্ক্যানে সতর্ক সংকেত দিয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসকদের পর্যালোচনায় মাত্র তিনশ রোগীর ক্ষেত্রে বাড়তি পরীক্ষা প্রয়োজন হয়েছে। তবু প্রশিক্ষণরত চিকিৎসক কিংবা বিশেষজ্ঞের অভাব থাকা হাসপাতালের জন্য এটি কার্যকর সহায়ক হতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

আস্থা সংকট ও মানবিক গল্প
চীনে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির অভিযোগে অনেক মানুষের আস্থা কমে গেছে। ফলে উপসর্গ ছাড়াই ক্যানসারের সন্দেহ জানালে কেউ কেউ ভাবেন, হাসপাতাল হয়তো অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে চাইছে। কিন্তু চিউ সিজুন এমন সন্দেহে ভোগেননি। চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি দ্রুত অস্ত্রোপচারে রাজি হন।
অস্ত্রোপচারের কয়েক মাস পর তিনি নিজেকে পুরোপুরি সুস্থ মনে করছেন। পরিবারের খামারে সবজি চাষে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। চিকিৎসক তাকে ভাগ্যবান বলেছিলেন। চিউ সিজুনের কথায়, তখন আর বলার কিছু ছিল না, শুধু স্বস্তি পাওয়াই ছিল তার প্রাপ্তি।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















