যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ ‘মাগা’ শিবিরের মধ্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি জোরালো হয়ে উঠেছে, তা শুধু অবৈধ নয়—বৈধ অভিবাসন কে হুমকি হিসেবে দেখছে। দ্য ইকোনমিস্ট–এর এশিয়া প্যাসিফিক সংস্করণের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কীভাবে আমেরিকার অভিবাসন নীতিতে ধীরে ধীরে এক গভীর পরিবর্তন ঘটছে।

আমেরিকা ফেস্টে অভিবাসন বিতর্ক
ফিনিক্সে টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ আয়োজিত বার্ষিক আমেরিকা ফেস্টে তৃতীয়বার অংশ নেন অ্যারিজোনার ৬৩ বছর বয়সী রিক রিচার্ডস। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সান্তা-টুপি পরা ছবি আঁকা সোয়েটার গায়ে দিয়ে তিনি একটি অধিবেশনে প্রশ্ন তোলেন—অভিবাসন নিয়ে ভাষা কি আরও সংযত হওয়া উচিত নয়? অবৈধ অভিবাসনের বিরোধিতা করা গেলেও বৈধ পথে আসা মানুষদের কি স্বাগত জানানো যায় না? জবাবে মঞ্চে থাকা রক্ষণশীল বক্তা জন ডয়েল স্পষ্ট করে বলেন, তাদের আপত্তি বৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধেও। তিনি অন্তত দশ বছরের জন্য সব ধরনের অভিবাসন বন্ধের প্রস্তাব দেন। শ্রোতাদের একাংশ তখন আরও এগিয়ে ‘চিরতরে’ বন্ধের স্লোগান তোলে।
জনমত বনাম মাগা রাজনীতি
অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক এখনও অভিবাসনকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখেন। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলেই এ বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন আছে। দক্ষিণ সীমান্তে চাপ বাড়ার সময় রিপাবলিকানদের সমর্থন কিছুটা কমলেও পরে তা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে ট্রাম্পের অবস্থান দ্বিধাগ্রস্ত। একদিকে তিনি কড়া নীতিতে অভিবাসীদের আটকাচ্ছেন, শিক্ষার্থীদের আটকে দিচ্ছেন এবং নাগরিকত্ব বাতিলের হুমকি দিচ্ছেন। অন্যদিকে তিনি আবার ‘সমন্বিত অভিবাসন সংস্কার’-এর কথাও বলছেন, যেখানে কড়া নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নাগরিকত্বের পথ ও দক্ষ কর্মীদের জন্য ভিসা বাড়ানোর ইঙ্গিত থাকে।
![]()
স্টিফেন মিলার ও ‘আক্রমণ’ তত্ত্ব
এই কঠোর নীতির নেপথ্যে আছেন স্টিফেন মিলার। তার দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র বহিরাগতদের ‘আক্রমণে’ হুমকির মুখে। এই ভাবনা ট্রাম্পের মূল সমর্থকদের কাছে জনপ্রিয় হলেও প্রযুক্তি খাতের বড় উদ্যোক্তাদের জন্য তা উদ্বেগজনক। কারণ দক্ষ কর্মীদের ভিসার ওপর নির্ভর করেই অনেক বড় প্রতিষ্ঠান টিকে আছে।
ইতিহাসে নেটিভিস্ট প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রতিবার বড় অভিবাসী ঢেউয়ের পরে দেশজ নেটিভিস্ট প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ১৯২৪ সালে কংগ্রেস অভিবাসন সীমিত করে কঠোর কোটা চালু করেছিল, যা এশীয়দের প্রবেশ কার্যত বন্ধ করে দেয়। তখন বলা হয়েছিল, ‘মেল্টিং পট’ ধারণা ব্যর্থ। এই কোটা ব্যবস্থা টিকে ছিল ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত। ওই বছর আইন বদলে পরিবারভিত্তিক ও দক্ষ শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

মাগা ভাবধারার বুদ্ধিবৃত্তিক শিকড়
১৯৯০ ও ২০০০ দশকে রক্ষণশীল চিন্তাবিদ প্যাট বুচানান আবার ‘মেল্টিং পট’ ধারণার বিরোধিতা করেন। তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ভাবনা আজকের মাগা নেতাদের প্রভাবিত করেছে। আমেরিকা ফেস্টে অংশ নেওয়া তরুণ রক্ষণশীলদের অনেকেই মনে করেন, সংহতি ভেঙে পড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘প্যান-ইউরোপীয়’ দেশ, যা বহিরাগতদের দ্বারা ‘দখল’ হয়েছে। এই দৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক আদর্শ নয়, বরং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যই জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি।
নির্বাহী আদেশে বৈষম্যমূলক নীতি
কংগ্রেস প্রায় আইন প্রণয়ন ছেড়ে দেওয়ায় ১৯৬৫ সালের আইন বদলানো কঠিন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কার্যত বৈষম্যমূলক অভিবাসন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনছে বলে মত দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। প্রায় ৪০টি দেশের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে, যার বেশিরভাগই আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ। এতে প্রতি পাঁচজন সম্ভাব্য অভিবাসীর একজন বাদ পড়ছেন। শরণার্থীদের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রবেশকারীদের বড় অংশই শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান।
![]()
ভিসা স্থগিত ও প্রশাসনিক জটিলতা
ডিসেম্বরে গ্রিন-কার্ড লটারি স্থগিত করা হয়। জানুয়ারিতে আরও ৭৫টি দেশের অভিবাসীদের ভিসা প্রক্রিয়াকরণ বন্ধের ঘোষণা আসে। যুক্তি দেওয়া হয়, এসব দেশের মানুষ নাকি সরকারি সুবিধার ওপর বেশি নির্ভরশীল। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, কল্যাণভাতা জালিয়াতির মামলায় অ-নাগরিকদের অংশগ্রহণ বরং কম।
আইনজীবীদের উদ্বেগ
অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, নীতির অস্পষ্টতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। কোথায় কী নিয়ম প্রযোজ্য—তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন ভিসা ফি ঘোষণা, নাগরিকত্ব বাতিলের হুমকি, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের চেষ্টা—সব মিলিয়ে মানুষ ও প্রতিষ্ঠান আতঙ্কে রয়েছে। অনেক নিয়োগকর্তা আগের তুলনায় কম আবেদন জমা দিচ্ছেন, আবার অনেক অভিবাসী আমেরিকায় থাকার সিদ্ধান্তই পুনর্বিবেচনা করছেন।

মেধা হারানোর ঝুঁকি
দীর্ঘদিন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টরা বৈধ অভিবাসন সমর্থন করতেন, কারণ দক্ষ ও উদ্যোক্তা মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্ভাবকদের ১৬ শতাংশ অভিবাসী হলেও তারা মোট উদ্ভাবনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী। যুক্তরাষ্ট্র যখন দরজা বন্ধ করছে, তখন কানাডার মতো দেশ বিদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের আকর্ষণে উদ্যোগ নিচ্ছে।
রিক রিচার্ডসের হতাশা
আমেরিকাফেস্টে নিজেকে একা মনে করেছেন রিক রিচার্ডস। ‘অভিবাসন স্থগিত’ ধারণা তিনি পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তার কথা ছিল সহজ—এক সময় সবাই অভিবাসীই ছিল। তিনি ভেবেছিলেন, আরও মানুষ তার পক্ষে দাঁড়াবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















