কয়েক বছর আগেও নাইজেরিয়ায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের নতুন লাইসেন্স নিলামে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ছিল না বললেই চলে। কিন্তু গত ডিসেম্বর শুরু হওয়া সর্বশেষ নিলাম সেই চিত্র বদলে দিয়েছে। মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরন এবং ফরাসি প্রতিষ্ঠান টোটালএনার্জিসের আগ্রহ নতুন করে আশা জাগিয়েছে। স্থানীয় জ্বালানি উদ্যোক্তা ইমানুয়েল উওয়ান্ডুর ভাষায়, সবার মধ্যেই এখন নতুন উত্তেজনা। সরকারের ধারণা, স্থলভাগ ও সমুদ্রের তেলসম্পদের দরপত্র থেকে আগামী এক দশকে প্রায় এক হাজার কোটি ডলার আসতে পারে।
দুই দশকের মন্দা কাটিয়ে তেলের প্রত্যাবর্তন
বিশ্ববাজারের আগ্রহ ফেরায় ইঙ্গিত মিলছে, দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে নাইজেরিয়ার তেল শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। দুই হাজার বাইশ সালে উৎপাদন নেমে গিয়েছিল প্রায় বিশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। তবে এবার বড় পরিবর্তন হলো, বিদেশি কোম্পানি নয়, নেতৃত্ব দিচ্ছে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। দুই হাজার পঁচিশ সালে প্রথমবারের মতো দেশের মোট তেল ও গ্যাস উৎপাদনে স্থানীয় বেসরকারি কোম্পানির অংশ বিদেশি জায়ান্টদের ছাড়িয়ে যায়। তেল খাত ক্রমেই আরও বেশি নাইজেরিয়ানের হাতে চলে আসছে, বিশেষ করে স্থলভাগে।

অর্থনীতির প্রাণ হলেও চাপে ছিল তেল
নাইজেরিয়ার অর্থনীতির জন্য তেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রপ্তানির বড় অংশই আসে এই খাত থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়তি খরচ আর নিরাপত্তাহীনতায় আফ্রিকার সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশটি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। অ্যাঙ্গোলা কিংবা নামিবিয়ার মতো নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে লড়াই কঠিন হয়ে ওঠে। নাইজার ডেল্টায় ভাঙচুর ও চুরির ঝুঁকির কথা বলে বহু বিদেশি কোম্পানি গভীর সমুদ্রের নিরাপদ প্রকল্পে সরে যায়।
সরকারি সংস্কার আর উৎপাদনের ঊর্ধ্বগতি
দুই হাজার তেইশ সালে ক্ষমতায় এসে প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবু ডেল্টা অঞ্চলের পরিস্থিতি সামলাতে নিরাপত্তা জোরদার, চুক্তি প্রক্রিয়া সহজ করা ও করছাড়ের মতো নানা সংস্কার শুরু করেন। এর ফল মিলতে শুরু করেছে। দুই হাজার পঁচিশ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় চৌদ্দ লাখ সাতচল্লিশ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন হয়েছে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সরকারের লক্ষ্য দুই হাজার ত্রিশ সালের মধ্যে তা বাড়িয়ে ত্রিশ লাখ ব্যারেলে নেওয়া।

স্থানীয় কোম্পানির উত্থান
এই পুনরুত্থানের চালিকাশক্তি স্থানীয় উদ্যোগ। রেনেসাঁ এনার্জি নামের স্থানীয় কোম্পানিগুলোর একটি জোট শেলের স্থলভাগের শাখা অধিগ্রহণ করেছে। সেপলাট এক্সনমোবিলের সব স্থল ও অগভীর সমুদ্রের লাইসেন্স কিনেছে বিপুল অঙ্কের বিনিময়ে। ওআন্দো ইতালির ইএনআইয়ের কাছ থেকে কয়েকটি তেল ব্লক কিনে দশকের শেষ নাগাদ বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। স্থানীয় নির্বাহীদের মতে, তারা ঝুঁকি নিতে বেশি প্রস্তুত এবং ডেল্টার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক সামলাতে বিদেশিদের চেয়ে দক্ষ।
নিরাপত্তা উন্নতি ও কম খরচে উৎপাদন
ডেল্টা অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতিও বড় ভূমিকা রাখছে। পাইপলাইন থেকে তেল চুরির হার আগের তুলনায় অনেক কমেছে। কয়েকটি তেলক্ষেত্রে উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে এবং নাশকতা প্রায় বন্ধ। দুই হাজার একুশ সালে পাস হওয়া পেট্রোলিয়াম শিল্প আইন অনুযায়ী, কোম্পানিগুলোকে স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য খরচের একটি অংশ দিতে হয়, যা আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে। তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় স্থানীয় কোম্পানিগুলো কম দামের বাজারেও লাভে থাকতে পারছে।

সন্দেহ, অর্থের সংকট আর ভবিষ্যৎ পথ
তবু সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। পরিবেশবাদী সংস্থাগুলোর অভিযোগ, কিছু স্থানীয় কোম্পানির দূষণ হার বেশি। আর্থিক দায় সামলানোর সক্ষমতা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থের জোগান। স্থানীয় ব্যাংকগুলো দুর্বল, পশ্চিমা ব্যাংক ঝুঁকি নিতে চায় না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকতে না পেরে হারিয়ে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রাকৃতিক গ্যাসে বিনিয়োগ করা কোম্পানিরাই টিকে থাকবে। নাইজেরিয়ার গ্যাস মজুত বিপুল এবং এর চাহিদা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। সরকারও গ্যাস খাতে করছাড় দিচ্ছে।
ঘরোয়া উন্নয়নের আশা
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ ও শিল্পায়ন দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে। স্থানীয় কোম্পানিরা বিদেশি রপ্তানিমুখী কাঠামোর বাইরে গিয়ে দেশের ভেতরের অবকাঠামো গড়ে তুলবে, এমনটাই প্রত্যাশা। নাইজেরিয়ার তেল শিল্পে তাই এবার গল্পটা শুধু রপ্তানির নয়, ঘরোয়া বিকাশেরও।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















