ইরানে সরকারবিরোধী অস্থিরতার সময় ইন্টারনেট ও ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া নতুন কিছু নয়। তবে জানুয়ারির শুরুতে যে মাত্রায় দেশটিকে ডিজিটাল অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তা অতীতের সব নজির ছাড়িয়ে গেছে। আট জানুয়ারি থেকে ইন্টারনেট সংযোগ নেমে আসে স্বাভাবিক অবস্থার মাত্র এক শতাংশে। এরপর দিনের পর দিন সেই অবস্থাই বজায় থাকে, কার্যত বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ।
ইন্টারনেট বন্ধের কৌশল
ইরানি কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণে একাধিক প্রযুক্তিগত পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটের সঙ্গে দেশের সংযোগ নির্ধারণকারী ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে তারা বাইরের প্রবাহ কার্যত বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে নেটওয়ার্কে চলাচল করা তথ্যের প্রতিটি অংশ পরীক্ষা করে নিষিদ্ধ সাইটে প্রবেশের পথ বন্ধ করা হয়। বিশেষভাবে নজরদারির আওতায় আসে ভিপিএন ব্যবহারের চেষ্টা, যা বহু ইরানি দীর্ঘদিন ধরে সেন্সর এড়িয়ে তথ্য আদানপ্রদানের জন্য ব্যবহার করে আসছে।

স্যাটেলাইট সংযোগেও হস্তক্ষেপ
এই দমননীতির বিরুদ্ধে বিকল্প পথ হিসেবে অনেকেই স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করার চেষ্টা করেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক প্রতিষ্ঠানের স্যাটেলাইট টার্মিনাল ইরানে বেআইনি হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেগুলো চোরাপথে দেশে ঢুকেছে। ধারণা করা হয়, হাজার হাজার টার্মিনাল ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। শুরুতে ইন্টারনেট বন্ধ থাকার পরও সেসব মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও বাইরে পৌঁছাতে থাকে। কিন্তু এগারো জানুয়ারির পর সেই প্রবাহ হঠাৎ কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরাঞ্চলে শক্তিশালী জ্যামার বসিয়ে স্যাটেলাইট সংকেত দুর্বল করা হয়েছে। উচ্চ স্থানে বসানো এসব যন্ত্র বিস্তৃত এলাকা ঢেকে ফেলতে পারে। পাশাপাশি দেশজুড়ে জিপিএস সংকেতেও বাধা সৃষ্টি করা হতে পারে, ফলে স্যাটেলাইট টার্মিনালগুলো তাদের অবস্থান নির্ণয় করতে না পেরে কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ চাপ
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, ইরানে ইন্টারনেট চালু করা সম্ভব হলে সেটিই তার অন্যতম লক্ষ্য। সাইবার আক্রমণের সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় এসেছে। তবে ইরানের টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাষ্ট্রের কড়া নিয়ন্ত্রণের কারণে এমন উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে সবচেয়ে সহজ উপায় হতে পারে বিপুল পরিমাণ স্যাটেলাইট টার্মিনাল ইরানে পৌঁছে দেওয়া।
এই ইন্টারনেট অন্ধকার শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দমননীতির অংশ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তথ্যের প্রবাহ থামিয়ে দিয়ে সরকার ভেতরের সহিংস দমন অভিযানের ছবি ও বাস্তবতা বিশ্ববাসীর চোখের আড়ালে রাখতে চেয়েছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















