০৮:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
দ্বৈত নাগরিকেরা স্থানীয় ভোটে প্রার্থী হতে পারলেও সংসদ নির্বাচনে কেন পারেন না? জুলাই শহীদ ও যোদ্ধাদের পরিবারে সহায়তায় আলাদা বিভাগ গঠনের পরিকল্পনা বিএনপির: তারেক রহমান সিলেট ওসমানী মেডিকেলে ইন্টার্নদের কর্মবিরতি দ্বিতীয় দিনে, চরম ভোগান্তিতে রোগীরা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে সপ্তাহের শুরু শক্ত অবস্থানে নির্বাচন ভবনের সামনে জেসিডির টানা কর্মসূচি, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অভিযোগ যাত্রাবাড়িতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ১১ বছরের শিশুর রেজা পাহলভি কি সত্যিই ইরানের বিপ্লবের মুখ হতে পারেন ইরানের ইন্টারনেট অন্ধকারে রাষ্ট্রের দমননীতি, কীভাবে আড়াল করা হলো সহিংসতা নাইজেরিয়ার তেল খাতে ঘুরে দাঁড়ানো, স্থানীয় কোম্পানির হাতেই নতুন জোয়ার আমেরিকার দরজা বন্ধের পথে মাগা শিবিরের লক্ষ্য এখন বৈধ অভিবাসনও থামানো

রেজা পাহলভি কি সত্যিই ইরানের বিপ্লবের মুখ হতে পারেন

ইরানের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই রেজা পাহলভিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না। শেষ শাহের পুত্র হওয়া সত্ত্বেও শাসকগোষ্ঠী, বিরোধী শক্তি এমনকি পশ্চিমা কূটনীতিকদের কাছেও তিনি ছিলেন প্রায় উপহাসের চরিত্র। বছরের পর বছর ওয়াশিংটনের আশপাশে বসবাস করে ক্ষমতাধরদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেও তাকে দেখা হতো বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক রাজতান্ত্রিক স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে। কিন্তু সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে হঠাৎ করেই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন তিনি।

ইরানে নতুন বিপ্লবের দাবি

জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ওয়াশিংটনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রেজা পাহলভি দাবি করেন, ইরান একটি পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার ভাষায়, বর্তমান শাসনব্যবস্থা শেষ মুহূর্তের ভয় দেখানোর কৌশল নিয়েছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে একসময় ‘জাভিদ শাহ’ স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে, যদিও পরে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে সেই আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে যায়। আন্দোলনের গতি কমে এলে তিনি আবারও রাস্তায় নামার আহ্বান জানান এবং প্রাদেশিক ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের জমায়েত গড়ে ওঠে।

ইরান ইসরায়েল যুদ্ধ ২০২৫ | খামেনি এখন কী করবেন?

ইরানি সমাজে মুক্তিদাতার খোঁজ

ইরানি সমাজে কিংবদন্তির নায়ক বা ত্রাণকর্তার প্রতি আকর্ষণ নতুন নয়। শাহনামার গল্পে বড় হয়ে ওঠা এই জনগোষ্ঠী ইতিহাসজুড়ে এমন চরিত্র খুঁজে এসেছে। উনিশ শতকের শেষভাগে ধর্মীয় নেতা খোমেনি সেই ভূমিকা পালন করেছিলেন। আজকের ইরানে কার্যত কোনো বিকল্প নেতৃত্ব নেই। সম্ভাব্য সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ, এমনকি পরিবেশবাদী সংগঠনও সহ্য করা হয় না। ফলে বহু মানুষের চোখে পাহলভি একমাত্র দৃশ্যমান মুখ হয়ে উঠছেন।

সংস্কারপন্থীদের প্রতি আস্থা হারানো

ইরানের জনগণ ধীরে ধীরে সংস্কারপন্থী রাজনীতিবিদদের ওপর আস্থা হারিয়েছে। একসময় নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিদের মাধ্যমে পরিবর্তনের আশা জাগলেও সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতা আরও কঠোর হয়েছে এবং অর্থনীতি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। সাবেক উপদেষ্টা ও আন্দোলনপন্থী নেতারাও জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন। রাজপথে এখন শোনা যায় পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি স্লোগান।

Iran's exiled 'crown prince' calls for mass labor strikes to topple regime  – POLITICO

সহিংসতা ও পরিবর্তনের রূপরেখা

রেজা পাহলভি নিজেকে অহিংস আন্দোলনের সমর্থক বলে দাবি করেন। তবে হামলার মুখে আত্মরক্ষার অধিকারকেও তিনি অস্বীকার করেন না। তার মতে, শাসকগোষ্ঠী বহু আগেই জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তিনি বলেন, দমনকারী শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করতে হবে, তবে রাষ্ট্রের অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া যাবে না। শাসন পতনের পরও বিদ্যুৎ, পানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো মৌলিক সেবা চালু থাকতে হবে। তার প্রকাশিত জরুরি পরিকল্পনায় জাতীয় সমঝোতা, নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনকে নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিশোধ ও শুদ্ধি অভিযানের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।

অস্থায়ী নেতৃত্ব ও গণভোটের প্রতিশ্রুতি

পাহলভি নিজেকে স্থায়ী শাসক নয়, বরং অস্থায়ী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেন। তার পরিকল্পনায় কয়েক মাসের মধ্যেই গণভোটের কথা রয়েছে, যেখানে জনগণ রাজতন্ত্র বা সংসদীয় প্রজাতন্ত্রের মধ্যে একটি বেছে নেবে। তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগের কথাও বলেছেন।

From Ideological Animosity to Strategic Rivalry: The Evolution of Iran's  Perception of Israel | INSS

বিরোধীদের সন্দেহ ও বিভাজন

তবে ইরানের বিরোধী শক্তির মধ্যে পাহলভিকে নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়ে গেছে। জাতিগত সংখ্যালঘুরা তার পিতার শাসনামলের দমননীতি ভুলে যায়নি। কুর্দি জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর একাংশ আলাদা রাষ্ট্রের দাবি তোলে। প্রবাসী বিরোধীদেরও তিনি কখনো ঐক্যবদ্ধ করতে পারেননি। অনেকেই মনে করেন, গণভোটের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রক্ষা করা হবে কি না, তা অনিশ্চিত। তেহরানের রাস্তায় শোনা আরেক স্লোগানেও সেই সংশয় ধরা পড়ে, যেখানে বলা হয় অত্যাচারী যেই হোক, নাম বদলালেই মুক্তি আসে না।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

রেজা পাহলভি বারবার বলেন, ইরানের ভবিষ্যৎ ইরানিদের হাতেই। বাইরের কোনো দেশের সিদ্ধান্তে তা নির্ধারিত হবে না। দূর থেকে তিনি আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বিপ্লবের কথা বললেও বাস্তবে তার ভূমিকা কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরান কি নতুন এক নেতৃত্বের দিকে এগোচ্ছে, নাকি আবারও বিভক্তির পথে হাঁটবে, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড়।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

দ্বৈত নাগরিকেরা স্থানীয় ভোটে প্রার্থী হতে পারলেও সংসদ নির্বাচনে কেন পারেন না?

রেজা পাহলভি কি সত্যিই ইরানের বিপ্লবের মুখ হতে পারেন

০৬:২৮:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

ইরানের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই রেজা পাহলভিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না। শেষ শাহের পুত্র হওয়া সত্ত্বেও শাসকগোষ্ঠী, বিরোধী শক্তি এমনকি পশ্চিমা কূটনীতিকদের কাছেও তিনি ছিলেন প্রায় উপহাসের চরিত্র। বছরের পর বছর ওয়াশিংটনের আশপাশে বসবাস করে ক্ষমতাধরদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেও তাকে দেখা হতো বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক রাজতান্ত্রিক স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে। কিন্তু সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে হঠাৎ করেই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন তিনি।

ইরানে নতুন বিপ্লবের দাবি

জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ওয়াশিংটনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রেজা পাহলভি দাবি করেন, ইরান একটি পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার ভাষায়, বর্তমান শাসনব্যবস্থা শেষ মুহূর্তের ভয় দেখানোর কৌশল নিয়েছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে একসময় ‘জাভিদ শাহ’ স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে, যদিও পরে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে সেই আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে যায়। আন্দোলনের গতি কমে এলে তিনি আবারও রাস্তায় নামার আহ্বান জানান এবং প্রাদেশিক ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের জমায়েত গড়ে ওঠে।

ইরান ইসরায়েল যুদ্ধ ২০২৫ | খামেনি এখন কী করবেন?

ইরানি সমাজে মুক্তিদাতার খোঁজ

ইরানি সমাজে কিংবদন্তির নায়ক বা ত্রাণকর্তার প্রতি আকর্ষণ নতুন নয়। শাহনামার গল্পে বড় হয়ে ওঠা এই জনগোষ্ঠী ইতিহাসজুড়ে এমন চরিত্র খুঁজে এসেছে। উনিশ শতকের শেষভাগে ধর্মীয় নেতা খোমেনি সেই ভূমিকা পালন করেছিলেন। আজকের ইরানে কার্যত কোনো বিকল্প নেতৃত্ব নেই। সম্ভাব্য সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ, এমনকি পরিবেশবাদী সংগঠনও সহ্য করা হয় না। ফলে বহু মানুষের চোখে পাহলভি একমাত্র দৃশ্যমান মুখ হয়ে উঠছেন।

সংস্কারপন্থীদের প্রতি আস্থা হারানো

ইরানের জনগণ ধীরে ধীরে সংস্কারপন্থী রাজনীতিবিদদের ওপর আস্থা হারিয়েছে। একসময় নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিদের মাধ্যমে পরিবর্তনের আশা জাগলেও সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতা আরও কঠোর হয়েছে এবং অর্থনীতি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। সাবেক উপদেষ্টা ও আন্দোলনপন্থী নেতারাও জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন। রাজপথে এখন শোনা যায় পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি স্লোগান।

Iran's exiled 'crown prince' calls for mass labor strikes to topple regime  – POLITICO

সহিংসতা ও পরিবর্তনের রূপরেখা

রেজা পাহলভি নিজেকে অহিংস আন্দোলনের সমর্থক বলে দাবি করেন। তবে হামলার মুখে আত্মরক্ষার অধিকারকেও তিনি অস্বীকার করেন না। তার মতে, শাসকগোষ্ঠী বহু আগেই জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তিনি বলেন, দমনকারী শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করতে হবে, তবে রাষ্ট্রের অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া যাবে না। শাসন পতনের পরও বিদ্যুৎ, পানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো মৌলিক সেবা চালু থাকতে হবে। তার প্রকাশিত জরুরি পরিকল্পনায় জাতীয় সমঝোতা, নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনকে নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিশোধ ও শুদ্ধি অভিযানের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।

অস্থায়ী নেতৃত্ব ও গণভোটের প্রতিশ্রুতি

পাহলভি নিজেকে স্থায়ী শাসক নয়, বরং অস্থায়ী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেন। তার পরিকল্পনায় কয়েক মাসের মধ্যেই গণভোটের কথা রয়েছে, যেখানে জনগণ রাজতন্ত্র বা সংসদীয় প্রজাতন্ত্রের মধ্যে একটি বেছে নেবে। তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগের কথাও বলেছেন।

From Ideological Animosity to Strategic Rivalry: The Evolution of Iran's  Perception of Israel | INSS

বিরোধীদের সন্দেহ ও বিভাজন

তবে ইরানের বিরোধী শক্তির মধ্যে পাহলভিকে নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়ে গেছে। জাতিগত সংখ্যালঘুরা তার পিতার শাসনামলের দমননীতি ভুলে যায়নি। কুর্দি জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর একাংশ আলাদা রাষ্ট্রের দাবি তোলে। প্রবাসী বিরোধীদেরও তিনি কখনো ঐক্যবদ্ধ করতে পারেননি। অনেকেই মনে করেন, গণভোটের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রক্ষা করা হবে কি না, তা অনিশ্চিত। তেহরানের রাস্তায় শোনা আরেক স্লোগানেও সেই সংশয় ধরা পড়ে, যেখানে বলা হয় অত্যাচারী যেই হোক, নাম বদলালেই মুক্তি আসে না।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

রেজা পাহলভি বারবার বলেন, ইরানের ভবিষ্যৎ ইরানিদের হাতেই। বাইরের কোনো দেশের সিদ্ধান্তে তা নির্ধারিত হবে না। দূর থেকে তিনি আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বিপ্লবের কথা বললেও বাস্তবে তার ভূমিকা কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরান কি নতুন এক নেতৃত্বের দিকে এগোচ্ছে, নাকি আবারও বিভক্তির পথে হাঁটবে, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড়।