ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে জন্ম নেওয়া এই বিক্ষোভে শত শত, এমনকি হাজারো মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—ভেনেজুয়েলার তুলনায় ইরানে চীনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বেশি হলেও কেন বেইজিং সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
ইরান সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের কড়া অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান পরিস্থিতি নিয়ে ‘খুব শক্ত বিকল্প’ বিবেচনার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোর ওপর নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে সামরিক হামলা, সাইবার আক্রমণ কিংবা আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।

চীনের জন্য ইরানের গুরুত্ব
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর তুলনায় ইরান চীনের কাছে অনেক বেশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে চীনের বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে ইরান গভীরভাবে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি হস্তক্ষেপ করে, তাহলে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং আঞ্চলিক প্রভাবও দুর্বল হয়ে পড়বে।
তবু কেন নীরব চীন
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের গবেষক জঁ-লুপ সামাঁ মনে করেন, ভেনেজুয়েলার তুলনায় ইরান পরিস্থিতি চীন অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তবে তাঁর মতে, এই গুরুত্ব সরাসরি হস্তক্ষেপে রূপ নেবে না। চীন সম্ভবত কূটনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং অভ্যন্তরীণ সংকটে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের বিরোধিতা জানাবে।
তিনি বলেন, ইরান চীনের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হলেও তাদের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক বা নিরাপত্তা জোট নেই। অংশীদারিত্ব মানেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বাধ্যবাধকতা নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি ইরানে হস্তক্ষেপ করে, চীন সরাসরি সংঘাতের মাঝখানে যাবে—এমন সম্ভাবনা খুব কম।

বেইজিংয়ের সরকারি অবস্থান
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার জানিয়েছে, তারা ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপের বিরোধী। যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে ‘জবরদস্তিমূলক’ বলেও সমালোচনা করেছে বেইজিং। একই সঙ্গে একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও বহির্বিশ্বের আইন প্রয়োগের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে চীন এবং নিজেদের বৈধ স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
আঞ্চলিক অস্থিরতার আশঙ্কা
সাংহাই আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ওয়েন শাওবিয়াও বলেন, চীনের প্রধান উদ্বেগ হলো ইরান সংকট থেকে আঞ্চলিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়া। সরকার পতনের পর সামাজিক বিশৃঙ্খলা, গৃহযুদ্ধ কিংবা রাষ্ট্র ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হলে তা দীর্ঘমেয়াদে পুরো অঞ্চলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এতে শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, ইরানে বড় ধরনের অস্থিরতা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও সমৃদ্ধিকে বিপন্ন করবে, যা চীনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্যও নেতিবাচক। তবু এসব ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বেইজিং সরাসরি জড়িয়ে পড়তে চাইবে না এবং দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।

অহস্তক্ষেপ নীতিতে অটল চীন
চীনের নর্থওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক ইয়ান ওয়েই বলেন, ইরানের কৌশলগত গুরুত্ব সত্ত্বেও চীন তার দীর্ঘদিনের অহস্তক্ষেপ নীতি বজায় রাখবে। সমর্থন মূলত অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং কূটনৈতিক পর্যায়েই থাকবে।
তার মতে, ভেনেজুয়েলার মতো ক্ষেত্রের মতোই চীন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু সরাসরি হস্তক্ষেপ বাস্তবসম্মত নয়। ট্রাম্পের হুমকি সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার সক্ষমতা চীনের আছে বলেও তিনি মনে করেন।
রাশিয়ার সঙ্গে পার্থক্য
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরান ইস্যুতে চীনের অবস্থান রাশিয়ার থেকে আলাদা। রাশিয়ার মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব ধীরে ধীরে কমছে। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন বা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়ায় মস্কোর দুর্বল ভূমিকা সেই ইঙ্গিতই দেয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও রাশিয়ার সক্ষমতা সীমিত।

চীনের কৌশল: সংলাপ ও ভারসাম্য
শাংহাইয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক নি লেশিয়ং বলেন, ইরান সংকটে চীনের কৌশল স্পষ্ট—সামরিক জড়িত থাকা এড়িয়ে সংলাপ ও সমঝোতার আহ্বান। ইরানে চীনের সরাসরি নিরাপত্তা উদ্বেগ নেই এবং কোনো পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য হওয়াও তারা চায় না।
রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছুই শৌজুনও মনে করেন, ট্রাম্পের বক্তব্যের কারণে চীন ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমাবে না। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরানের স্থিতিশীলতা শুধু মধ্যপ্রাচ্য বা উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষকদের অভিমত, ইরানে চীনের ঝুঁকি ভেনেজুয়েলার তুলনায় বেশি হলেও বেইজিং তার প্রচলিত নীতির বাইরে যাবে না। কূটনীতি, বাণিজ্য ও নীরব পর্যবেক্ষণ—এই তিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে চীনের ভূমিকা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















