কাবুলের উপকণ্ঠে একটি ছেঁড়া তাঁবু। একটি মাত্র ম্লান বাতির আলোয় শুকনো রুটি আর চা—দিনের একমাত্র খাবার নিয়ে বসেছেন সামিউল্লাহ ও তাঁর স্ত্রী বিবি রেহানা। পাশে পাঁচ সন্তান আর তিন মাসের নাতি। শীতের রাতে তাঁদের এই নীরব বসে থাকা যেন আফগানিস্তানের বর্তমান বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ক্ষুধা, শীত আর অনিশ্চয়তায় ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে জীবন।
মৃত্যুকেই মেনে নেওয়ার হতাশা
পাঁচান্ন বছর বয়সী সামিউল্লাহ বলেন, এমন এক পর্যায়ে তাঁরা পৌঁছেছেন, যেখানে মৃত্যুকে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। প্রতিবেশী ইরান ও পাকিস্তান থেকে গত এক বছরে ফেরত পাঠানো লক্ষ লক্ষ আফগানের একজন তিনি। দুই প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে ও তাঁদের স্ত্রীসহ পুরো পরিবার রাতারাতি ইরানের একটি সাধারণ বাড়ি ছেড়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে এই অস্থায়ী তাঁবুতে। পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর সময় তাঁদের সঞ্চয় সঙ্গে আনতে পারেননি। সেই টাকা থাকলে অন্তত শীতটা পার করা যেত।

দেশে ফিরে আরও গভীর সংকট
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ফিরে পরিস্থিতি যে আরও খারাপ হয়েছে, তা লুকানোর কিছু নেই। জাতিসংঘের খাদ্য কর্মসূচির হিসাবে অন্তত এক কোটি সত্তর লাখ মানুষ এখন তীব্র খাদ্যসংকটে। সামিউল্লাহ বলেন, তাঁদের জীবনে যা হওয়ার হয়েছে, কিন্তু অন্তত সন্তানদের ভবিষ্যৎ ভালো হোক—এই প্রার্থনা টুকু বেঁচে আছে।
ফেরত আসা মানুষের ঢল ও বাস্তবতা
আফগান প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফেরত আসা নাগরিকদের পরিবহন, বাসস্থান, চিকিৎসা ও খাদ্য সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে চার দশকের যুদ্ধ, সম্পদহানি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর দারিদ্র্য দূর করা এক দিনে সম্ভব নয়। উন্নয়ন কর্মসূচির ফল পেতে সময় লাগে, তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে না—এই বাস্তবতার কথাও স্বীকার করা হয়েছে।

আঞ্চলিক রাজনীতি ও বহিষ্কার
খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ইরান ও পাকিস্তান মিলিয়ে পঁচিশ লাখের বেশি আফগানকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ইরানে নিরাপত্তা ও সম্পদ সংকটের কথা বলে বহিষ্কার জোরদার করা হয়েছে। পাকিস্তানেও সীমান্ত হামলার অভিযোগ ঘিরে একই পথে হাঁটা হয়েছে, যদিও আফগানিস্তান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
শীতে কাজ নেই, আয় নেই
শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের সুযোগ প্রায় বন্ধ। একই সঙ্গে ফেরত আসা মানুষের কারণে দেশের জনসংখ্যা প্রায় এক দশমাংশ বেড়েছে। খাদ্য কর্মসূচির দেশীয় প্রধান জানান, আগে যারা ইরান ও পাকিস্তানে কাজ করতেন, তাঁদের পাঠানো টাকাই ছিল বহু পরিবারের জীবনরেখা। এখন সেই আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আরও ত্রিশ লাখ মানুষ নতুন করে তীব্র ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়েছে

সহায়তা কমছে, বাড়ছে অপুষ্টি
আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গত বছর আফগানিস্তানে অপুষ্টির হার ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ। চলতি বছর তা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রায় দুই লাখ শিশু নতুন করে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত হতে পারে।
ত্রাণ কেন্দ্রে দীর্ঘ সারি
কাবুল থেকে দূরের একটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে চাল আর তেলের বস্তা দেখা গেলেও তা পর্যাপ্ত নয়। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো মানুষের চোখে ক্লান্তি আর ভয়। আট কন্যার মা এক বিধবা নারী বলেন, এই সামান্য সহায়তা দিয়েই শীত পার করতে হবে। কখনো খাবার জোটে, কখনো জোটে না।
চিকিৎসাকেন্দ্রে বাড়ছে রোগী
রাজধানীর একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে অপুষ্ট শিশুদের ভিড় বেড়েছে দ্বিগুণ। প্রতিদিন অন্তত ত্রিশটি অপুষ্টির ঘটনা সামলাতে হচ্ছে। দেওয়া খাবার ও ওষুধ সাময়িক উপকার দিলেও দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার জন্য তা যথেষ্ট নয়। এক মা বলেন, সন্তান কিছুদিন ভালো থাকে, তারপর আবার ওজন কমে যায়।

জীবন আর আগের মতো নেই
তালেবান ক্ষমতায় আসার পর বহু পরিবার সরকারি চাকরি হারিয়েছে। ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছে অর্থনীতি। এক তরুণী মা বলেন, জীবন আর কখনো আগের মতো থাকে না। পরিবর্তন মানেই এখানে আরও কষ্ট।
ঠান্ডা রাতে অসহায় পিতার আর্তি
সন্ধ্যা নামলে সামিউল্লাহ কাঠ জোগাড় করেন, বিবি রেহানা আগুন জ্বালান। তবু ঠান্ডায় কাঁপে শিশুরা। বাবা তাদের বুকে জড়িয়ে ধরে শুধু বলেন, ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তাঁর নিজের প্রশ্নের উত্তর নেই। আগে বিদেশে কাজ করে অন্তত পেট ভরে খাওয়াতে পারতেন। এখন নেই কাজ, নেই জীবিকা, নেই নিশ্চিত আগামী।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















