১০:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
ড্রাগনের ছায়া ছেড়ে নতুন পথে এমিলিয়া ক্লার্ক, পনিস দিয়ে শুরু টিভিতে নতুন অধ্যায় অস্ট্রেলিয়ায় ভারী বৃষ্টির পর বুল শার্কের আক্রমণে সৈকত বন্ধ ট্রাম্প কেন অতীতের পররাষ্ট্রনীতি ভুল থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন না ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাসে হাইড্রোজেন মিশিয়ে দূষণ কমানোর চেষ্টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ঢাকা (পর্ব-৮৭) গ্রিনল্যান্ড ঘিরে শুল্ক হুমকি, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইউরোপের কড়া অবস্থান দর্পণের সামনে নিজেই আলোকচিত্রী: দুবাইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর নতুন আত্মপ্রতিকৃতি অভিজ্ঞতা কিনলিং পর্বতমালার নিষিদ্ধ আওতাই ট্রেইল অনুসন্ধান সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্বতারোহণ প্রতিকূলতা পেরিয়ে ঐতিহাসিক সাফল্য চীনের অর্থনীতি, জিডিপি ছুঁল ১৪০ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বাড়ির আঙিনায় সবার জন্য সবজি বাগান, দুবাইয়ে এক আমিরাতির নীরব মানবিক বিপ্লব

ট্রাম্প কেন অতীতের পররাষ্ট্রনীতি ভুল থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন না

নিজের সব দম্ভ আর উচ্চকণ্ঠতার পরও খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পেরেছিলেন যে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে এতটা শব্দ ও উত্তেজনা নিয়ে হাজির হবেন।

গত বারো মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন আমেরিকার সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা, যার লক্ষ্য তাদের নিকটবর্তী অঞ্চলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। খনিজসমৃদ্ধ ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড থেকে শুরু করে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কীর্ণ পথ পানামা পর্যন্ত, হোয়াইট হাউস তার ভূরাজনৈতিক ক্ষুধা স্পষ্ট করে দিয়েছে।

ট্রাম্প নিজে সহ অনেকে তার পররাষ্ট্রনীতিকে ‘ডনরো মতবাদ’ বলে অভিহিত করছেন। এটি দুই শতাব্দী আগে তার পূর্বসূরি জেমস মনরোর বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির প্রতি ইঙ্গিত করে, যিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে পশ্চিম গোলার্ধে কোনো অমার্কিন শক্তির হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কাজ হিসেবে গণ্য হবে।

তবে এই ব্যাখ্যাটি অন্তত দুটি বড় সমস্যার মুখে পড়ে।

প্রথমত, ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা মোটেও কেবল পশ্চিম গোলার্ধে সীমাবদ্ধ নয়। গত বছরের জুনে অপারেশন মিডনাইট হ্যামারের মাধ্যমে ইরানের কথিত পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা থেকে শুরু করে থাইল্যান্ড-কাম্বোডিয়া ও ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে নিজেকে আত্মঘোষিত শান্তির দূত হিসেবে জোরেশোরে জড়িয়ে পড়া পর্যন্ত, নিজের লক্ষ্য পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক শক্তি ব্যবহারে তিনি কোনো দ্বিধা দেখাননি।

দ্বিতীয়ত, এটিকে মতবাদ বলা মানে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরিকল্পনা ও সচেতন হিসাবনিকাশ ধরে নেওয়া। অথচ মতবাদের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা। শুল্ক নিয়ে তার দোদুল্যমান অবস্থান থেকে শুরু করে ইউক্রেন প্রশ্নে হঠাৎ মেজাজ পরিবর্তন—সব ক্ষেত্রেই ট্রাম্পের একমাত্র ধারাবাহিকতা হলো অসামঞ্জস্য।

২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর ইউক্রেনের কিয়েভে রুশ ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ভাঙা জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছেন আহত এক বৃদ্ধা নারী।

ন্যায্যভাবে বলতে গেলে, কিছু সংঘাতে তার এই বেপরোয়া দৃষ্টিভঙ্গি আপাতত ফল দিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের গ্যাংস্টার হামলা

ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর দ্রুত অপসারণ এবং অন্তর্বর্তী শাসনব্যবস্থার আংশিক সহভাগিতার ফলে বিশ্বের বৃহত্তম তেলভাণ্ডার কার্যত মার্কিন করপোরেশনগুলোর জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। যদিও সেই তেল নিরাপদে উত্তোলন ও পরিশোধন করা যাবে কি না, তা ভিন্ন প্রশ্ন।

ইরানে অর্থনৈতিক দুরবস্থার জেরে শুরু হওয়া কয়েক সপ্তাহব্যাপী দেশজুড়ে বিক্ষোভ সহিংস সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে হাজারো বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক নিন্দা সৃষ্টি হয়, যার ফলে শাসকগোষ্ঠী প্রবল চাপে পড়েছে।

নিজ দেশের কাছাকাছি অঞ্চলে ট্রাম্প জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে গ্রিনল্যান্ড দাবি করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে। ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যরা জোরালো আপত্তি ও প্রতীকী প্রতিবাদ জানালেও, এর বাইরে এগোনোর মতো প্রস্তুতি তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।

এই আপাত সাফল্য সত্ত্বেও ট্রাম্পের মনে রাখা উচিত অনিচ্ছাকৃত পরিণতির নিয়ম। এত জটিল ও পরস্পরজড়িত বাস্তবতায় তার এই কঠোর হস্তক্ষেপ ভবিষ্যতে অস্থিতিশীলতার উৎস হয়ে উঠতে পারে।

ভেনেজুয়েলা এখন ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গোষ্ঠীর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে আছেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রোদ্রিগেজ ও তার ভাই জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রোদ্রিগেজের নেতৃত্বাধীন বেসামরিক গোষ্ঠী, অন্যদিকে রয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলোর নেতৃত্বে আধাসামরিক ও গোয়েন্দা গোষ্ঠী।

ইরানে, নানা মতের বিরোধী কণ্ঠ শাসনব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের আহ্বান জানালেও, যুক্তরাষ্ট্রের উসকানির ধারণা আসলে কঠোরপন্থীদের আরও শক্ত করেছে। এর ফলে তারা বিক্ষোভ দমনে বৈধতা খুঁজে পেয়েছে। যদি কোণঠাসা করা হয়, তবে প্রতিরোধের অক্ষের নেতৃত্বদানকারী হিসেবে পরিচিত তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চল, সাব-সাহারা আফ্রিকা ও ইউরোপজুড়ে নিজেদের প্রভাবশালী শক্তিগুলো সক্রিয় করতে পারে, যা এসব অঞ্চলকে আরও অস্থিরতার মধ্যে টেনে আনবে।

২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি তেহরানে এক বিক্ষোভে জড়ো হন সাধারণ মানুষ। একই মাসে সরকারপন্থী ও সরকারবিরোধী সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়।

ট্রাম্পের দল হয়তো মনে করছে যে তারা ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে, অর্থাৎ সরাসরি সেনা মোতায়েন না করে নির্ভুল হামলায় জোর দেওয়া। কিন্তু তারা সম্ভবত আরও গভীর সেই শিক্ষাটি উপেক্ষা করেছে, যার শিকড় শীতল যুদ্ধের সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। বাহ্যিক চাপ দিয়ে স্বৈরশাসন থেকে উত্তরণ খুব কম ক্ষেত্রেই শান্তিপূর্ণ হয় এবং অধিকাংশ সময় সফলও হয় না। এই ধরনের পরিস্থিতির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা চরমপন্থা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড বিশেষ ভালো নয়।

বিচ্ছিন্ন বৈশ্বিকায়নের এই সময়ে মিত্রদের সমর্থন ছাড়া খুব কম যুদ্ধই জেতা সম্ভব। ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির অসমতা এবং ব্রাসেলসে যুক্তরাষ্ট্রঘেঁষা নেতৃত্ব থাকার কারণে আমেরিকান নীতিনির্ধারকেরা হয়তো ভাবছেন যুক্তরাষ্ট্র অপরিহার্য। তাদের নতুন করে ভাবা উচিত।

Americans disapprove of Trump's foreign policy. His escapades are likely to  cost him | Sidney Blumenthal | The Guardian

২০২৫ সালে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ এবং ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় ৬৩ শতাংশ বেড়েছে, যা ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের আগের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। চলতি বছরের প্রথম কয়েক সপ্তাহেই ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানির শেয়ারের দাম আরও বেড়েছে। ইতিহাসের ধারা ইউরোপকে ধীরে ধীরে আরও আত্মনির্ভরশীল প্রতিরক্ষার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এর সুস্পষ্ট প্রভাব পড়ছে ইউরোপীয় জোটের পররাষ্ট্রনীতিতে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষায়। গত তিন মাসে স্পেনের রাজা ফেলিপে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মিশেল মার্টিন আলাদাভাবে বেইজিংয়ে চীনা নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।

এই ঘটনাগুলো চীনের ইউরোপ নীতিতেও কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে তারা জোটের পরিবর্তে পৃথক দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করছে।

১৪ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসের সরকারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে একটি বিতর্কিত ব্যঙ্গচিত্র পোস্ট করা হয়, যেখানে লেখা ছিল, গ্রিনল্যান্ডবাসী কোন পথে যাবে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার পতাকা। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতাকা দিয়ে পুনরায় পোস্ট করে।

ইউরোপীয়দের দরকষাকষির ক্ষমতা নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদের সমালোচনা করা যেতেই পারে। তবে খামখেয়ালি হোয়াইট হাউসের প্রতি ইউরোপজুড়ে যে বিরূপ মনোভাব তৈরি হচ্ছে, তা হালকাভাবে নেওয়া ঠিক হবে না।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সাম্প্রতিক বেইজিং সফরে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ঘোষণা এই পরিবর্তিত জনমতের শক্তির কথাই বলে। পিউ গবেষণা কেন্দ্রের এক জরিপে দেখা গেছে, কানাডার ৭৭ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পের ওপর আস্থা রাখেন না, যিনি বারবার দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের একান্নতম অঙ্গরাজ্য বানানোর হুমকি দিয়েছেন। একই জরিপে ৭৫ শতাংশ মানুষ তাকে বিপজ্জনক বলে মনে করেন।

ট্রাম্পের দলের মনে রাখা উচিত সেই প্রবাদটি—মানুষ ও ইঁদুরের সবচেয়ে সুচিন্তিত পরিকল্পনাও প্রায়ই ভেস্তে যায়। সেখানে হঠাৎ ভাবা, দুর্বলভাবে গড়া ও এলোমেলোভাবে বাস্তবায়িত পরিকল্পনার পরিণতি যে কতটা অনিশ্চিত হতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।

জনপ্রিয় সংবাদ

ড্রাগনের ছায়া ছেড়ে নতুন পথে এমিলিয়া ক্লার্ক, পনিস দিয়ে শুরু টিভিতে নতুন অধ্যায়

ট্রাম্প কেন অতীতের পররাষ্ট্রনীতি ভুল থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন না

০৮:০০:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

নিজের সব দম্ভ আর উচ্চকণ্ঠতার পরও খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পেরেছিলেন যে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে এতটা শব্দ ও উত্তেজনা নিয়ে হাজির হবেন।

গত বারো মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন আমেরিকার সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা, যার লক্ষ্য তাদের নিকটবর্তী অঞ্চলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। খনিজসমৃদ্ধ ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড থেকে শুরু করে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কীর্ণ পথ পানামা পর্যন্ত, হোয়াইট হাউস তার ভূরাজনৈতিক ক্ষুধা স্পষ্ট করে দিয়েছে।

ট্রাম্প নিজে সহ অনেকে তার পররাষ্ট্রনীতিকে ‘ডনরো মতবাদ’ বলে অভিহিত করছেন। এটি দুই শতাব্দী আগে তার পূর্বসূরি জেমস মনরোর বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির প্রতি ইঙ্গিত করে, যিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে পশ্চিম গোলার্ধে কোনো অমার্কিন শক্তির হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কাজ হিসেবে গণ্য হবে।

তবে এই ব্যাখ্যাটি অন্তত দুটি বড় সমস্যার মুখে পড়ে।

প্রথমত, ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা মোটেও কেবল পশ্চিম গোলার্ধে সীমাবদ্ধ নয়। গত বছরের জুনে অপারেশন মিডনাইট হ্যামারের মাধ্যমে ইরানের কথিত পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা থেকে শুরু করে থাইল্যান্ড-কাম্বোডিয়া ও ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে নিজেকে আত্মঘোষিত শান্তির দূত হিসেবে জোরেশোরে জড়িয়ে পড়া পর্যন্ত, নিজের লক্ষ্য পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক শক্তি ব্যবহারে তিনি কোনো দ্বিধা দেখাননি।

দ্বিতীয়ত, এটিকে মতবাদ বলা মানে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরিকল্পনা ও সচেতন হিসাবনিকাশ ধরে নেওয়া। অথচ মতবাদের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা। শুল্ক নিয়ে তার দোদুল্যমান অবস্থান থেকে শুরু করে ইউক্রেন প্রশ্নে হঠাৎ মেজাজ পরিবর্তন—সব ক্ষেত্রেই ট্রাম্পের একমাত্র ধারাবাহিকতা হলো অসামঞ্জস্য।

২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর ইউক্রেনের কিয়েভে রুশ ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ভাঙা জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছেন আহত এক বৃদ্ধা নারী।

ন্যায্যভাবে বলতে গেলে, কিছু সংঘাতে তার এই বেপরোয়া দৃষ্টিভঙ্গি আপাতত ফল দিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের গ্যাংস্টার হামলা

ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর দ্রুত অপসারণ এবং অন্তর্বর্তী শাসনব্যবস্থার আংশিক সহভাগিতার ফলে বিশ্বের বৃহত্তম তেলভাণ্ডার কার্যত মার্কিন করপোরেশনগুলোর জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। যদিও সেই তেল নিরাপদে উত্তোলন ও পরিশোধন করা যাবে কি না, তা ভিন্ন প্রশ্ন।

ইরানে অর্থনৈতিক দুরবস্থার জেরে শুরু হওয়া কয়েক সপ্তাহব্যাপী দেশজুড়ে বিক্ষোভ সহিংস সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে হাজারো বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক নিন্দা সৃষ্টি হয়, যার ফলে শাসকগোষ্ঠী প্রবল চাপে পড়েছে।

নিজ দেশের কাছাকাছি অঞ্চলে ট্রাম্প জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে গ্রিনল্যান্ড দাবি করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে। ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যরা জোরালো আপত্তি ও প্রতীকী প্রতিবাদ জানালেও, এর বাইরে এগোনোর মতো প্রস্তুতি তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।

এই আপাত সাফল্য সত্ত্বেও ট্রাম্পের মনে রাখা উচিত অনিচ্ছাকৃত পরিণতির নিয়ম। এত জটিল ও পরস্পরজড়িত বাস্তবতায় তার এই কঠোর হস্তক্ষেপ ভবিষ্যতে অস্থিতিশীলতার উৎস হয়ে উঠতে পারে।

ভেনেজুয়েলা এখন ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গোষ্ঠীর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে আছেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রোদ্রিগেজ ও তার ভাই জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রোদ্রিগেজের নেতৃত্বাধীন বেসামরিক গোষ্ঠী, অন্যদিকে রয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলোর নেতৃত্বে আধাসামরিক ও গোয়েন্দা গোষ্ঠী।

ইরানে, নানা মতের বিরোধী কণ্ঠ শাসনব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের আহ্বান জানালেও, যুক্তরাষ্ট্রের উসকানির ধারণা আসলে কঠোরপন্থীদের আরও শক্ত করেছে। এর ফলে তারা বিক্ষোভ দমনে বৈধতা খুঁজে পেয়েছে। যদি কোণঠাসা করা হয়, তবে প্রতিরোধের অক্ষের নেতৃত্বদানকারী হিসেবে পরিচিত তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চল, সাব-সাহারা আফ্রিকা ও ইউরোপজুড়ে নিজেদের প্রভাবশালী শক্তিগুলো সক্রিয় করতে পারে, যা এসব অঞ্চলকে আরও অস্থিরতার মধ্যে টেনে আনবে।

২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি তেহরানে এক বিক্ষোভে জড়ো হন সাধারণ মানুষ। একই মাসে সরকারপন্থী ও সরকারবিরোধী সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়।

ট্রাম্পের দল হয়তো মনে করছে যে তারা ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে, অর্থাৎ সরাসরি সেনা মোতায়েন না করে নির্ভুল হামলায় জোর দেওয়া। কিন্তু তারা সম্ভবত আরও গভীর সেই শিক্ষাটি উপেক্ষা করেছে, যার শিকড় শীতল যুদ্ধের সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। বাহ্যিক চাপ দিয়ে স্বৈরশাসন থেকে উত্তরণ খুব কম ক্ষেত্রেই শান্তিপূর্ণ হয় এবং অধিকাংশ সময় সফলও হয় না। এই ধরনের পরিস্থিতির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা চরমপন্থা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড বিশেষ ভালো নয়।

বিচ্ছিন্ন বৈশ্বিকায়নের এই সময়ে মিত্রদের সমর্থন ছাড়া খুব কম যুদ্ধই জেতা সম্ভব। ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির অসমতা এবং ব্রাসেলসে যুক্তরাষ্ট্রঘেঁষা নেতৃত্ব থাকার কারণে আমেরিকান নীতিনির্ধারকেরা হয়তো ভাবছেন যুক্তরাষ্ট্র অপরিহার্য। তাদের নতুন করে ভাবা উচিত।

Americans disapprove of Trump's foreign policy. His escapades are likely to  cost him | Sidney Blumenthal | The Guardian

২০২৫ সালে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ এবং ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় ৬৩ শতাংশ বেড়েছে, যা ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের আগের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। চলতি বছরের প্রথম কয়েক সপ্তাহেই ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানির শেয়ারের দাম আরও বেড়েছে। ইতিহাসের ধারা ইউরোপকে ধীরে ধীরে আরও আত্মনির্ভরশীল প্রতিরক্ষার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এর সুস্পষ্ট প্রভাব পড়ছে ইউরোপীয় জোটের পররাষ্ট্রনীতিতে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষায়। গত তিন মাসে স্পেনের রাজা ফেলিপে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মিশেল মার্টিন আলাদাভাবে বেইজিংয়ে চীনা নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।

এই ঘটনাগুলো চীনের ইউরোপ নীতিতেও কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে তারা জোটের পরিবর্তে পৃথক দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করছে।

১৪ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসের সরকারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে একটি বিতর্কিত ব্যঙ্গচিত্র পোস্ট করা হয়, যেখানে লেখা ছিল, গ্রিনল্যান্ডবাসী কোন পথে যাবে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার পতাকা। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতাকা দিয়ে পুনরায় পোস্ট করে।

ইউরোপীয়দের দরকষাকষির ক্ষমতা নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদের সমালোচনা করা যেতেই পারে। তবে খামখেয়ালি হোয়াইট হাউসের প্রতি ইউরোপজুড়ে যে বিরূপ মনোভাব তৈরি হচ্ছে, তা হালকাভাবে নেওয়া ঠিক হবে না।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সাম্প্রতিক বেইজিং সফরে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ঘোষণা এই পরিবর্তিত জনমতের শক্তির কথাই বলে। পিউ গবেষণা কেন্দ্রের এক জরিপে দেখা গেছে, কানাডার ৭৭ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পের ওপর আস্থা রাখেন না, যিনি বারবার দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের একান্নতম অঙ্গরাজ্য বানানোর হুমকি দিয়েছেন। একই জরিপে ৭৫ শতাংশ মানুষ তাকে বিপজ্জনক বলে মনে করেন।

ট্রাম্পের দলের মনে রাখা উচিত সেই প্রবাদটি—মানুষ ও ইঁদুরের সবচেয়ে সুচিন্তিত পরিকল্পনাও প্রায়ই ভেস্তে যায়। সেখানে হঠাৎ ভাবা, দুর্বলভাবে গড়া ও এলোমেলোভাবে বাস্তবায়িত পরিকল্পনার পরিণতি যে কতটা অনিশ্চিত হতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।