রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক—এই ছয় ব্যাংক দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি মন্দ ঋণের ভারে মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছে। ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় অর্ধেক অর্থই এখন আর ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ আত্মসাৎ এবং জটিল আইনি প্রক্রিয়ার কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
মোট ঋণ ও মন্দ ঋণের চরম চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত এই ছয় ব্যাংকের মোট ঋণের স্থিতি ৩ লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় অর্ধেক। এই খেলাপি ঋণের ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা ইতোমধ্যে মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে, যা আদায় হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত নেই।

বড় গ্রুপের ঋণে ব্যাংক লুটপাট
বিগত সরকারের সময়ে এস আলম, বেক্সিমকো, নাসাসহ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেয়। এসব ঋণের বড় অংশ তারা ফেরত দেয়নি। সরকার পরিবর্তনের পর এসব গ্রুপের অনেক শীর্ষ ব্যক্তি কারাগারে গেছেন কিংবা দেশ ছেড়েছেন, ব্যবসা কার্যক্রমও প্রায় বন্ধ। ঋণের বিপরীতে জমা দেওয়া বন্ধকি সম্পদের কাগজপত্রে নানা জটিলতা থাকায় ব্যাংকগুলোর পক্ষে এসব অর্থ উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আদায় প্রক্রিয়ার ব্যর্থতা ও ঝুঁকি
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে মন্দ ঋণ আদায়ের নজির খুবই সীমিত। দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল আইনি প্রক্রিয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঋণ আদায় সম্ভব হয় না। সময় যত গড়াচ্ছে, এই বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যাংকের হিসাব থেকে স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তত বাড়ছে।

ব্যাংকভিত্তিক মন্দ ঋণের অবস্থা
জনতা ব্যাংক মন্দ ঋণে সবচেয়ে বিপর্যস্ত। ব্যাংকটির মোট ঋণ ৯৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৬৯ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা মন্দ ঋণ, অর্থাৎ প্রায় ৭২ শতাংশ। সোনালী ব্যাংকের মোট ঋণ ৮৯ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা, এর মধ্যে মন্দ ঋণ ১৮ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের মন্দ ঋণ ২৯ হাজার ৩২১ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ২১ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের ৮ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মন্দ ঋণ ৯৫৩ কোটি টাকা।
ব্যাংক ব্যবস্থাপনার দাবি
অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম জানান, খেলাপি ঋণ আদায়ে চাপ বাড়ানো হয়েছে এবং লক্ষ্যের একটি অংশ আদায়ও হয়েছে। তবে খেলাপিরা একের পর এক অজুহাত দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় ঋণ তফসিল ও আদালতের মাধ্যমে আদায়ের গতি কিছুটা বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্ক বিশ্লেষণ

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, একসময় ব্যাংক খাতে ভয়াবহ অনিয়ম চললেও তা নিয়ে নীরবতা ছিল। সরকার পরিবর্তনের পর স্পষ্ট হয়েছে, কীভাবে কয়েকটি গ্রুপ নিয়ম ভেঙে ব্যাংকের অর্থ লুট করেছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, ঋণ বিতরণে নিয়ম না মানা, প্রকল্প যাচাই ও গ্রাহক মনিটরিংয়ের ঘাটতির কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত প্রভিশন না রাখতে পারা ব্যাংকগুলোর জন্য বড় অশুভ সংকেত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থান
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ইচ্ছাকৃতসহ সব খেলাপির কাছ থেকে অর্থ আদায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর অবস্থানে রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য নির্দিষ্ট আদায় লক্ষ্য ঠিক করে দেওয়া হয়েছে এবং আদালতে ঝুলে থাকা মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন গভর্নর।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এই দেড় লাখ কোটি টাকার মন্দ ঋণ সংকট এখন শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, পুরো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















