মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক শুল্ক হুমকি শুধু আরেকটি বাণিজ্যিক চাপ নয়। এটি বিশ্ব রাজনীতি ও ভূকৌশলের মানচিত্রে নতুন এক অস্বস্তিকর দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তিকে সরাসরি কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এই উদ্যোগ আগের সব বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে অস্বাভাবিক চাপ
গত মঙ্গলবার গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক শহরে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটের সামনে এক ব্যক্তির প্রতিবাদ সেই উত্তেজনার প্রতীক হয়ে ওঠে। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইউরোপের কয়েকটি দেশ যদি গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অধিভুক্ত করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে, তাহলে তাদের ওপর প্রথমে দশ শতাংশ এবং পরে পঁচিশ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। মিত্র দেশের বিরুদ্ধে কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে শুল্ক ব্যবহারের এমন নজির আধুনিক ইতিহাসে বিরল।
ট্রাম্পের মূল নীতির চূড়ান্ত রূপ
এই পদক্ষেপ ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের বিশ্বাসেরই চূড়ান্ত প্রকাশ। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল অর্থনীতি ও বাজার শক্তি এমন প্রভাব তৈরি করতে পারে, যা আগে সামরিক শক্তি দিয়ে অর্জন করতে হতো। যদি এই কৌশল সফল হয়, তবে ভবিষ্যতে বাণিজ্যযুদ্ধ আর শুধু আমদানি রপ্তানি বা ঘাটতি কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ভূখণ্ড দখলের মতো বিষয়েও ব্যবহৃত হতে পারে।
অর্থনৈতিক জবরদস্তির পুরোনো ও নতুন চেহারা
বহু দশক ধরেই বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মতো অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে এসেছে। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের আধুনিক উদাহরণ হিসেবে চীনের আচরণকে দেখা হয়, যেখানে তারা তাইওয়ান ইস্যুতে জাপানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্পও এখানেই অসম শক্তির হিসাব কষছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ডেনমার্কের তুলনায় প্রায় পঁয়ষট্টি গুণ বড়, যা তাঁর দৃষ্টিতে চাপ প্রয়োগের আদর্শ ক্ষেত্র।
চীনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা, ইউরোপে আগ্রাসী ভঙ্গি
চীনের ওপর একশ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি ট্রাম্প আগেও দিয়েছিলেন, কিন্তু চীনা পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মুখে সরে আসতে হয়েছিল। ইউরোপের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি তুলনামূলক কম বলে মনে করছেন তিনি। যদিও দেশীয় আইন, কংগ্রেস ও আদালত তাত্ত্বিকভাবে তাঁর ক্ষমতা সীমিত করতে পারে, বাস্তবে বিদ্যমান আইন ব্যাখ্যার মাধ্যমে তিনি প্রায় সীমাহীন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা নিজের হাতে রেখেছেন।
আদালত ও জনমতের অনিশ্চয়তা
মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট শিগগিরই জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে রায় দিতে পারে। সেই রায় ট্রাম্পের হাত কতটা বেঁধে দেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, এক আইন বাধা হলে অন্য আইনের মাধ্যমে শুল্ক আরোপ চালু রাখা হবে। ফলে শেষ পর্যন্ত বড় ভূমিকা রাখবে জনমত। শুল্কের জেরে মূল্যস্ফীতি বাড়লে, রপ্তানি কারক ও শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাজার অস্থির হতে পারে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনে শাসক দলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।
কেন গ্রিনল্যান্ড আলাদা
গত বছর ট্রাম্প বিভিন্ন দেশে শুল্ক চাপিয়ে বড় ধরনের বাণিজ্য যুদ্ধ এড়াতে পেরেছিলেন, কারণ তাঁর লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক। কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের প্রশ্নে বিষয়টি ভিন্ন। কোনো দেশ অর্থনৈতিক ক্ষতি সহ্য করলেও ভূখণ্ড ছাড়তে রাজি হয় না, ইউক্রেন তার উদাহরণ। এক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, দশ শতাংশ শুল্ক সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মোট উৎপাদন মাত্র শূন্য দশমিক এক থেকে শূন্য দশমিক দুই শতাংশ কমাতে পারে, যা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য মূল্য হতে পারে।
ইউরোপের বড় আশঙ্কা
ইউরোপের মূল ভয় গ্রিনল্যান্ড নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেন বা সামরিক জোট থেকে সরে আসে। সেই আশঙ্কাতেই ইউরোপীয় দেশগুলো আগের এক দফায় শুল্ক মেনে নিয়েছিল। কিন্তু এখন আবার একই চাপ এলে তারা কতটা নতি স্বীকার করবে, তা অনিশ্চিত। বিশ্লেষকদের মতে, আজ গ্রিনল্যান্ড, কাল আইসল্যান্ড বা নরওয়ের কোনো অংশের দাবি উঠলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।
অর্থনৈতিক যুদ্ধের সীমা
ইতিহাস বলছে, শুধু অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে বড় কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন। ইরান ও ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার পরও শেষ পর্যন্ত সামরিক শক্তির ভূমিকা ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্যবস্তু দেশগুলো বিকল্প পথ খুঁজে নেয়। চীন নতুন বাজারে গেছে, ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসের বিকল্প জোগাড় করেছে, কানাডা ও চীন শুল্ক কমানোর চুক্তিতে পৌঁছেছে।
শেষ পর্যন্ত কী বার্তা
যখন অর্থনীতির চেয়েও বড় কিছু জড়িত থাকে, তখন অর্থনৈতিক যুদ্ধের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে আনছে, যেখানে বিশ্ব বুঝতে পারছে, বাণিজ্য আর রাজনীতি এখন আর আলাদা নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















