সত্তরের দশক ছিল বিপ্লবী সহিংসতার যুগ। তখন বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ছিল শিথিল, আর সরাসরি টেলিভিশন সম্প্রচার গোটা পৃথিবীকে বানিয়ে ফেলেছিল সন্ত্রাসের মঞ্চ। এই সময়কে কেন্দ্র করেই জেসন বার্কের বই ‘দ্য রেভলিউশনিস্টস’ নতুন করে তুলে ধরেছে এক ভয়াল ইতিহাস, যেখানে আদর্শ, রাজনীতি ও সহিংসতা একে অন্যকে জড়িয়ে বদলে দিয়েছে বৈশ্বিক নিরাপত্তার ধারণা।
সত্তরের দশকের শুরুতে কয়েক দিনের ব্যবধানে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক বিমান ছিনতাই বিশ্ববাসীকে স্তব্ধ করে দেয়। ফিলিস্তিনের পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইনের সশস্ত্র সদস্যরা পাঁচটি বিমান দখলের চেষ্টা চালায়। এর মধ্যে কিছু ব্যর্থ হলেও তিনটি যাত্রীবাহী বিমানকে জোর করে জর্ডানের মরুভূমিতে নামানো হয়। এই নাটকীয় অভিযানের নেপথ্য পরিকল্পনাকারী ওয়াদি হাদ্দাদ ছিলেন খ্রিস্টান, তবে ধর্ম ছিল না তাঁদের প্রেরণা। তাঁদের বিশ্বাস গড়ে উঠেছিল মার্ক্সবাদ, উপনিবেশবিরোধিতা ও আরব জাতীয়তাবাদের মতো চরম ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের মিশেলে, যেখানে ফিলিস্তিনকে দেখা হয়েছিল বৈশ্বিক বিপ্লবের সূচনাবিন্দু হিসেবে।

বামপন্থী সন্ত্রাসের উত্থান
এই আদর্শই সত্তরের দশকে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার নানা প্রান্তে সহিংসতার আগুন ছড়ায়। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপ তখন এর মোকাবিলায় হিমশিম খায়। মিউনিখ অলিম্পিকে ইসরায়েলি ক্রীড়াবিদদের হত্যার মতো ঘটনাগুলো সেই সময়ের ভয়াবহতার প্রতীক হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারার অবসান ঘটলেও তার জায়গা নেয় ধর্মভিত্তিক সন্ত্রাস, যার প্রকাশ দেখা যায় লেবাননের ইরানসমর্থিত মিলিশিয়া, পরে ওসামা বিন লাদেন এবং আরও পরে ইসলামিক স্টেটের উত্থানে।
আদর্শের উত্তরাধিকার
জেসন বার্ক এই ইতিহাসকে আলাদা আলাদা অধ্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে দেখাননি। বরং তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, কীভাবে ধর্মনিরপেক্ষ বিপ্লবী সন্ত্রাসের ব্যর্থতা পরবর্তী ধর্মীয় চরমপন্থার পথ তৈরি করে দেয়। দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজে তরুণদের রাজনৈতিক মুক্তির খোঁজ, সর্বগ্রাসী মতাদর্শের আকর্ষণ এবং নাটকীয় সহিংসতার ঝোঁক—এই সুতোগুলো দুই ধারাকেই যুক্ত করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্ক্সবাদ তার মর্যাদা হারালে এবং ঐতিহ্যবাহী মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করলে ইসলামপন্থা অনেকের কাছে বিকল্প আদর্শ হয়ে ওঠে।
জর্ডানের মরুভূমিতে আগুন
সেপ্টেম্বরের সেই বহুচর্চিত বিমান ছিনতাই কেবল আকাশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। যাত্রীদের জর্ডানের হোটেল ও গোপন আশ্রয়ে আটকে রাখা হয়, আর বিশ্বমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে উড়োজাহাজ বিস্ফোরণের দৃশ্য। এই পরিস্থিতিতে জর্ডানের রাজা হুসেইন সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশ থেকে ফিলিস্তিনি গেরিলাদের বিতাড়িত করেন। শেষ পর্যন্ত অনেক জিম্মি মুক্তি পেলেও এই সহিংসতা ফিলিস্তিনি আন্দোলনের প্রতি আন্তর্জাতিক জনমতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিনিময়ে মুক্তি পায় মাত্র কয়েকজন বন্দি, যা ভবিষ্যতের বহু ছিনতাইয়ের মতোই পরিণত হয় অর্থহীন সাফল্যে।

ইউরোপীয় মিত্রতা ও নৈতিক বিভ্রান্তি
বইটির শক্তিশালী অংশগুলোর একটি হলো ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে পশ্চিম জার্মান বামপন্থীদের জোটের বর্ণনা। বনের গণতান্ত্রিক সরকারকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল মনে করত এবং সেই যুক্তি থেকেই ইহুদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে ন্যায্যতা দেয়। হলোকাস্টের মাত্র কয়েক দশক পর এই বিকৃত যুক্তি ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস হয়ে ওঠে।
এনটেব্বে থেকে কার্লোস
উগান্ডার এনটেব্বে বিমানবন্দরে ছিনতাই ও জিম্মি নাটক এবং পরে ইসরায়েলি কমান্ডো অভিযানের কাহিনি এই বইয়ের সবচেয়ে নাড়া দেওয়া অংশগুলোর একটি। একই সঙ্গে উঠে আসে কার্লোস দ্য জ্যাকালের মতো চরিত্রের জীবন, যিনি বিপ্লবের নামে বিলাসী জীবনযাপন করেও নিজেকে নিপীড়িতের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিণতি হয় আজীবন কারাদণ্ড, আর কারাগার থেকেই তিনি নতুন প্রজন্মের চরমপন্থার প্রতি সমর্থন জানান।

শেষ কথা
এই দীর্ঘ বর্ণনা পাঠককে এক ধরনের পুনরাবৃত্তির অনুভূতি দেয়। সত্তরের দশকের ছিনতাইকারীরা যেমন বলেছিল বিশ্বকে নিজেদের কথা শোনাতে, তেমনি পরবর্তী প্রজন্মের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভাষ্যেও সেই একই যুক্তি ফিরে আসে। ‘দ্য রেভলিউশনিস্টস’ মনে করিয়ে দেয়, এই সহিংস চক্রের শুরু কোথায়। শেষ কোথায়, তা এখনো অনিশ্চিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















