একসময় জীবনকে দেখা হতো নির্দিষ্ট ছকে। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি, সংসার গড়া, তারপর ষাটের ঘরে পৌঁছেই অবসর। ধারণা ছিল, সত্তরের বেশি খুব বেশি মানুষ বাঁচবে না। তাই বার্ধক্য মানেই ধীরে ধীরে গুটিয়ে যাওয়া জীবন। কিন্তু সেই পরিচিত ছবি এখন আর বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
আজ মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি দিন বাঁচছে, আবার ভালোভাবেই বাঁচছে। যুক্তরাষ্ট্রে গড় আয়ু এখন প্রায় ঊনআশি বছর। ফলে পঁয়ষট্টি বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা কোটি কোটি ছাড়িয়ে গেছে। শুধু একটি দেশের গল্প নয়, বিশ্বজুড়েই একই চিত্র। আগামী কয়েক দশকে প্রতি পাঁচজন মানুষের একজন হবে ষাটের ওপরে। জাপানের মতো দেশে তো ইতিমধ্যেই বয়স্ক মানুষের সংখ্যা তরুণদের ছাড়িয়ে গেছে।
বয়সের কাঠামো বদলে যাওয়া সমাজ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজের বয়সের কাঠামোতেই বড় পরিবর্তন এসেছে। জন্মহার কমছে, মানুষ দীর্ঘদিন কর্মক্ষম থাকছে। এর অর্থ, শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মজীবন আর অবসরের যে পুরোনো কাঠামো আমরা জানতাম, তা আর কাজের উপযোগী নয়। আগে জীবনকে তিন ধাপে ভাগ করা হতো—শেখা, কাজ, অবসর। এখন সেই ধাপগুলো আর সোজা লাইনে চলছে না।

অনেকের মতে, আজকের বাস্তবতায় শেখা আর কাজ পুরো জীবনের মধ্যেই ছড়িয়ে থাকা দরকার। অবসর মানে আর শেষ অধ্যায় নয়। বরং জীবনের নানা পর্যায়ে কাজের গতি কমানো বা বাড়ানো, আবার নতুন কিছু শেখা—এসবই হয়ে উঠছে নতুন স্বাভাবিকতা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বার্ধক্যের নতুন ঠিকানা
এই বদলের একটি বাস্তব উদাহরণ দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ক্যাম্পাসের মধ্যেই গড়ে উঠেছে বিশেষ আবাসন, যেখানে বয়স্ক মানুষরা থাকেন ছাত্রছাত্রীদের পাশেই। তারা শুধু আলাদা হয়ে থাকেন না, বরং ক্লাস করেন, শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেন, কখনো সহকারী হিসেবেও কাজ করেন।
এতে দুই প্রজন্মই লাভবান হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে জীবনের অভিজ্ঞতা আর বাস্তব জ্ঞান, আর বয়স্ক মানুষরা পাচ্ছেন নতুন উদ্দেশ্য আর সামাজিক সংযোগ। অনেকেই বলছেন, এতে একাকিত্ব কমছে, মানসিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হচ্ছে।
কাজের ধারণায় পরিবর্তনের ডাক

শুধু শিক্ষা নয়, কাজের জগতেও বদল দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট বয়স হলেই অবসর বাধ্যতামূলক। অথচ কাজের ধরন বদলেছে। শারীরিক শ্রমের বদলে জ্ঞান আর অভিজ্ঞতার গুরুত্ব বেড়েছে। ফলে বয়স্ক কর্মীরা চাইলে আরও বহু বছর মূল্যবান অবদান রাখতে পারেন।
কিছু দেশে এরই মধ্যে ভিন্ন মডেল দেখা যাচ্ছে। সেখানে অবসরের পরও কর্মীদের অফিসে আসার সুযোগ দেওয়া হয়, হালকা কাজ বা পরামর্শের ভূমিকা থাকে। এতে প্রতিষ্ঠান যেমন অভিজ্ঞতা ধরে রাখতে পারে, তেমনি তরুণ কর্মীদের মাঝেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা তৈরি হয়।
একসঙ্গে থাকার নতুন ভাবনা
বয়স বাড়ার সঙ্গে কোথায় ও কীভাবে মানুষ থাকবে, সেটাও বড় প্রশ্ন। গবেষণায় দেখা গেছে, আলাদা করে রাখা আবাসনে থাকলে অনেক বয়স্ক মানুষ নিজেকে বিচ্ছিন্ন ও একা মনে করেন। তাই বহু দেশে একাধিক প্রজন্মের মানুষ একসঙ্গে থাকার আবাসন জনপ্রিয় হচ্ছে।

নিউইয়র্কের একটি আবাসনে দেখা যায়, একই ভবনে তরুণ ও বয়স্করা থাকছেন। ছাদে বাগান করছেন, একে অপরকে প্রযুক্তি শেখাচ্ছেন, গল্প করছেন। অনেক বয়স্ক বাসিন্দার ভাষায়, এতে তারা বেশি শক্তি আর জীবনের অর্থ খুঁজে পান।
সবার জন্য দীর্ঘ ও ভালো জীবন
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য, আর্থিক নিরাপত্তার অভাব—এসব কারণে অনেকেই এই ‘নতুন বার্ধক্য’ উপভোগ করতে পারছেন না। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি এখনই নীতি ও মানসিকতায় পরিবর্তন না আসে, তবে সমাজের একটি বড় অংশ পিছিয়ে পড়বে।
দীর্ঘ জীবন শুধু সংখ্যার বিষয় নয়, সেই জীবন যেন সক্রিয়, অর্থপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ হয়—এটাই বড় লক্ষ্য। আর তার জন্য দরকার পরিকল্পিত উদ্যোগ, প্রজন্মের মধ্যে সংযোগ আর বয়স নিয়ে পুরোনো ধারণা ভেঙে ফেলার সাহস।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















