নারীর শরীরে একটি অঙ্গ আছে, যাকে এতদিন শুধু সন্তান ধারণের সঙ্গে জুড়ে দেখা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান বলছে, সেই অঙ্গই হয়তো সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের চাবিকাঠি। ডিম্বাশয়কে কেন্দ্র করে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন গবেষকেরা। প্রশ্ন উঠেছে, ডিম্বাশয়ের বার্ধক্য ধীর করা গেলে কি মানুষের সামগ্রিক বার্ধক্যও ধীর করা সম্ভব।
তিমির ডিম্বাশয়ে জীবনের রহস্য
ডিনা এমেরা যখন পর্দায় ভেসে ওঠা তিমির ডিম্বাশয়ের অণুবীক্ষণিক ছবি দেখেন, তখন তিনি বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়ে যান। উত্তর মেরুর বোউহেড তিমি পৃথিবীর দীর্ঘতম আয়ুষ্কালের স্তন্যপায়ী প্রাণীর একটি। এরা দুইশ বছরের বেশি বাঁচে, এমনকি শতবর্ষ পেরিয়েও প্রজননক্ষম থাকে। বিবর্তন জীববিজ্ঞানী এমেরার মনে প্রশ্ন জাগে, কী এমন বিশেষত্ব আছে তাদের ডিম্বাশয়ে, যা এত দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি বছরের পর বছর ধরে আদিবাসী শিকারিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন, যাতে গবেষণার জন্য নমুনা পাওয়া যায়।

অবশেষে একটি স্ত্রী তিমির ডিম্বাশয় থেকে সংগৃহীত টিস্যু পরীক্ষা করে তিনি দেখেন, কোষগুলো আশ্চর্য রকমের সুস্থ। গবেষণায় আগেই জানা গেছে, এই তিমির ডিএনএ মেরামতের ক্ষমতা অসাধারণ। এমেরার ধারণা, এই ক্ষমতার সঙ্গেই তাদের দীর্ঘ প্রজনন কাল ও দীর্ঘায়ু জড়িত। এই রহস্য উন্মোচন মানব স্বাস্থ্যের জন্যও নতুন পথ খুলে দিতে পারে।
ডিম্বাশয় শুধু প্রজননের জন্য নয়
বিজ্ঞানীরা এখন বুঝতে পারছেন, ডিম্বাশয় কেবল ডিম্বাণু উৎপাদনের যন্ত্র নয়। এটি হরমোন ও সংকেতের মাধ্যমে শরীরের নানা অঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করে। হাড়, হৃদযন্ত্র, বিপাক ক্রিয়া এমনকি মস্তিষ্কের সঙ্গে এর নিবিড় যোগাযোগ আছে। ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা কমতে শুরু করলে শরীর জুড়ে তার প্রভাব পড়ে।
গবেষকদের ভাষায়, ডিম্বাশয় যেন শরীরের একটি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। এই কেন্দ্র দুর্বল হলে হঠাৎ করেই নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। ঋতুবন্ধ, যা গড়ে একান্ন বছর বয়সে আসে, তার পর থেকেই হৃদ্রোগ, স্মৃতিভ্রংশ, হাড় ক্ষয় ও বিপাকজনিত রোগের আশঙ্কা দ্রুত বাড়ে।
বার্ধক্যের আগেই বুড়িয়ে যায় ডিম্বাশয়
গবেষণায় দেখা গেছে, মানবদেহের সবচেয়ে দ্রুত বার্ধক্যগ্রস্ত অঙ্গগুলোর একটি হলো ডিম্বাশয়। চল্লিশ বছর বয়সে যেখানে মস্তিষ্ককে বৃদ্ধ বলা যায় না, সেখানে ডিম্বাশয় তখনই কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ডিম্বাশয়ের কোষে ঠিক সেই একই বার্ধক্য প্রক্রিয়া চলে, যা শরীরের অন্য অঙ্গেও দেখা যায়, তবে অনেক বেশি গতিতে।
এই দ্রুত বার্ধক্যই বিজ্ঞানীদের নতুন আশার দিশা দেখাচ্ছে। ডিম্বাশয় যেহেতু দ্রুত বুড়িয়ে যায়, তাই এটি ব্যবহার করে বার্ধক্য প্রতিরোধী চিকিৎসা বা ওষুধের কার্যকারিতা তুলনামূলক কম সময়ে যাচাই করা সম্ভব।
ঋতুবন্ধ বিলম্বিত করার স্বপ্ন
কিছু গবেষক আরও এক ধাপ এগিয়ে ভাবছেন, ঋতুবন্ধ কি পুরোপুরি ঐচ্ছিক করা যায়। একটি বিশেষ হরমোন নিয়ে কাজ চলছে, যা ডিম্বাশয়ের ফলিকল নষ্ট হওয়ার গতি কমাতে পারে। প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই হরমোন কেমোথেরাপির মতো চিকিৎসার সময় ও ডিম্বাশয়কে সুরক্ষা দিতে পারে।

এই গবেষণার লক্ষ্য শুধু সন্তান ধারণ নয়, বরং দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা। গবেষকদের মতে, ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা দীর্ঘদিন বজায় রাখা গেলে নারীর জীবনের সুস্থ সময়কাল বাড়ানো সম্ভব।
নারীস্বাস্থ্যে গবেষণার ঘাটতি
দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা গবেষণায় নারী শরীর উপেক্ষিত থেকেছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের খুব সামান্য অংশই নারীস্বাস্থ্যে যায়। ফলে ডিম্বাশয় নিয়ে মৌলিক অনেক প্রশ্নেরই উত্তর আজও অজানা।
তবে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। নতুন গবেষণা উদ্যোগ, তহবিল ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণের মাধ্যমে ডিম্বাশয়ের বার্ধক্য মাপার পদ্ধতি বের করার চেষ্টা চলছে। রক্ত পরীক্ষা কিংবা আলট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে ডিম্বাশয়ের অবস্থা বোঝার দিকেও অগ্রগতি হচ্ছে।

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ডিম্বাশয় নিয়ে এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি শুধু নারীদের জন্য নয়, পুরো মানবজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ডিম্বাশয়ের রহস্য উন্মোচন করা গেলে বার্ধক্য, দীর্ঘায়ু ও সুস্থ জীবনের ধারণাই বদলে যেতে পারে।
অনেক গবেষকের মতে, যদি এই সমস্যা পুরুষদের বেশি প্রভাবিত করত, তবে সমাধান অনেক আগেই হয়ে যেত। এখন সময় এসেছে নারীর শরীর ও স্বাস্থ্যকে বিজ্ঞানের মূল আলোচনায় আনার।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















