চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষ যে গণতন্ত্র প্রত্যাশা করেছিল, বাস্তবে তার বদলে গড়ে উঠেছে মবোক্রেসির পরিবেশ। ফলে ভোটাধিকার আর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় নেই; এটি এখন নজরদারি, ভয় ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বন্দী। এই পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর ও আন্তরিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
নীতি সংলাপের প্রেক্ষাপট
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন: সংখ্যালঘু অধিকার, প্রতিনিধিত্ব ও গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা’ শীর্ষক নীতি সংলাপে এসব বিষয় উঠে আসে। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের আয়োজনে সংলাপটি পরিচালনা করেন সংগঠনের সভাপতি জিল্লুর রহমান। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংখ্যালঘু সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
পরিচয় সংকট ও ঐক্যের অভাব
সংলাপে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া বলেন, দেশে এখনো আত্মপরিচয়ের সংকট দূর হয়নি। আদিবাসীদের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা যায়নি, আর সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রেও দুর্বলতা রয়ে গেছে। বিভক্তির কারণে অভিন্ন দাবি ও অভিন্ন কষ্টের জায়গা তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, অধিকার আদায়ে ঐক্য গড়ে তুলতে পারলে জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব হবে এবং তখনই সমস্যার সমাধানের পথ খুলবে।

প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক
গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, গত ৫৪ বছরে একের পর এক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। প্রতিটি সরকারের আমলে নিপীড়ন ও বৈষম্য চলেছে, কিন্তু কার্যকর সমাধান আসেনি। বর্তমান সরকারের সময়েও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। তিনি বলেন, মানুষ গণতন্ত্র চেয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে পেয়েছে মবোক্রেসি। সামনে নির্বাচন নিয়ে কিছু আশা থাকলেও সেই আশা বাস্তব হবে কি না, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ভোট দিতে ভয়
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বলেন, ২০২৬ সালের নির্বাচন আদৌ অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। সংখ্যালঘুদের বাস্তবতা হলো—ভোট দিলেও হামলার আশঙ্কা, না দিলেও একই ঝুঁকি। নানা হুমকির কারণে একজন সংখ্যালঘু ভোটার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আগামী নির্বাচনে নিরাপদ ও সঠিকভাবে ভোট দেওয়া যাবে কি না, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মণীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের বহু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়নি। সংসদে সংখ্যালঘুদের জন্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন সংরক্ষণের কথা উঠলেও তা কার্যকর হয়নি। সরকার থেকে শুরু করে নির্বাহী প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত নানা কাঠামোগত সমস্যা অন্তর্ভুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে। আন্তরিক উদ্যোগের অভাবই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বঞ্চনাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে।

গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের সংকট
সভাপতির বক্তব্যে জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে বহু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সেগুলোর অধিকাংশই সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। জুলাই আন্দোলনের পর একটি ভালো নির্বাচনের আশা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে বহু মানুষ—বিশেষ করে সংখ্যালঘুরা—এই প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অনেক রাজনৈতিক শক্তির কাছেই সংখ্যালঘুদের বিষয়টি গুরুত্ব পায় না।
তিনি আরও বলেন, ঢাকার বাইরের অনেক এলাকায় সংখ্যালঘুরা ভোট দিতে যাওয়া নিরাপদ মনে করে না। মূল সংকটটি আসলে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের সংকট। দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করা গেলে, তখনই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হবে এবং অন্যান্য সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















