সব প্রাপ্তবয়স্কই পশ্চিমা সিগারেট খেতেন, কিন্তু আমার প্রপিতামহী হোমা-জুন নয়। তাঁর সিগারেটগুলো ছিল পাতলা ও ছোট, আর সেখান থেকে বেরোনো মিষ্টি ও মস্কি ধোঁয়ায় ভরে থাকত সেই ঘরটি, যেখানে তেহরানে আমার শৈশবের বড় অংশে দাদা-দাদি ও বাবা-মায়ের সঙ্গে তিনি থাকতেন। হোমা-জুন এই সিগারেট পছন্দ করতেন নামের মিলের কারণে নয়—সেগুলোর নামও ছিল হোমা—বরং কারণ সেগুলো তৈরি হতো ইরানেই।
তিনি জন্মেছিলেন ১৯০৫ সালের ইরানি সাংবিধানিক বিপ্লবের পরপরই, যখন পতনশীল কাজার রাজবংশ জনগণের দাবির মুখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটি নির্বাচিত সংসদ মেনে নিতে বাধ্য হয়। সে সময় মানুষের দাবি ছিল, শাসনব্যবস্থা হবে ‘মাশরুত’, অর্থাৎ শাসিতের সম্মতির ওপর নির্ভরশীল। হোমা-জুনের বাবা ও স্বামী দুজনেই মাশরুতেহ আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, একসময়ের জীর্ণ সাম্রাজ্য ইরানকে সার্বভৌম মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
কিন্তু আজও সেই আকাঙ্ক্ষা অধরাই রয়ে গেছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অধীনে অর্ধশতক কাটানোর পর—যে শাসনব্যবস্থা শুরুতেই নিজেকে ‘না পশ্চিমা, না প্রাচ্য’ বলে ঘোষণা করেছিল—ইরান আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিদেশি আগ্রাসন ও অভ্যন্তরীণ ভাঙনের ঝুঁকিতে।
প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইসলামি প্রজাতন্ত্র পিছু হটছে। গত গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলায় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের সন্ত্রাসী হামলার পর ইসরায়েল একের পর এক ইরানি মদদপুষ্ট গোষ্ঠীর শক্তি খর্ব করেছে, যাদের প্রভাব লেভান্ট থেকে আরব উপদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দেশের ভেতরেও তেহরান সরকার ইসলামি নৈতিকতার বিধিনিষেধ কার্যকর রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক হিজাব, যা একসময় বেত্রাঘাত বা তার চেয়েও কঠোর শাস্তির মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া হতো, তা নিয়েও এখন তাদের নিয়ন্ত্রণ শিথিল।
আমার মতো প্রবাসী ইরানিসহ বহু ইরানির কাছে এই সময়টা এক ধরনের মিশ্র অনুভূতির। নিষ্ঠুর ও অযৌক্তিক একটি ব্যবস্থার ভেতরের দ্বন্দ্ব ও বাইরের দম্ভের চাপে ভেঙে পড়া দেখে স্বস্তি পাওয়া যায়। কিন্তু সেই স্বস্তি তিক্ততায় বদলে যায়, যখন চোখ যায় তুরস্ক, সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে। সভ্যতার দিক থেকে ইরানিরা যেসব দেশকে অবহেলার চোখে দেখে, তারাই আজ এগিয়ে যাচ্ছে—সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা কিংবা অন্তত স্বাভাবিকতার দিকে।
![]()
আজ ইরান, তার গৌরবময় সভ্যতাগত ঐতিহ্য সত্ত্বেও, দরিদ্র, দমনমূলক, অকার্যকর ও দুর্নীতিগ্রস্ত একটি রাষ্ট্র। দেশটি বিশ্বের অন্যতম মারাত্মক মেধাপাচারের শিকার, যা ২০২৪ সালে রেকর্ড ছুঁয়েছে।
তাহলে কী ঘটল? আধুনিক যুগের শেষ বড় বিপ্লবগুলোর একটি ঘটিয়েও ইরানিরা কেন এত কম অর্জন করতে পারল? জাতীয় চরিত্রের কোন দিকগুলো ব্যাখ্যা করে, কীভাবে দেশটি পঞ্চাশ বছর নষ্ট করল?
এর উত্তর আংশিকভাবে নিহিত আছে ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রচিন্তার চরমবাদে। বিশুদ্ধতার প্রতি এক ধরনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা দেশটিকে আবেগী আদর্শবাদে ঠেলে দেয়। সেই আদর্শ ভেঙে পড়লে জন্ম নেয় নিষ্ক্রিয়তা, নৈরাশ্য ও নৈতিক অবক্ষয়। এই প্রবণতা যদি নিয়ন্ত্রণহীন থাকে, তবে আয়াতোল্লাদের শাসনের পর যে কোনো ব্যবস্থার ভবিষ্যৎই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এই বিশুদ্ধতার মোহ বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে আধুনিকতার সূচনালগ্নের ইরানে, যখন মজলিস ও সংবিধান প্রতিষ্ঠার লড়াই আমার প্রপিতামহীর শৈশবকে সংজ্ঞায়িত করেছিল।
এই লড়াইয়ের পূর্বসূরি দেখা যায় ১৮৯০ সালে, যখন কাজার শাহ একটি ব্রিটিশ কোম্পানিকে ইরানে তামাক উৎপাদন ও বিক্রির ওপর পঞ্চাশ বছরের একচেটিয়া অধিকার দেন। কোম্পানিটি আশা করেছিল, রাজদরবারকে নির্দিষ্ট অর্থ ও মুনাফার একটি অংশ দেওয়ার পরও বছরে বিপুল লাভ করবে।
ইরানে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর এমন অসম চুক্তি নতুন কিছু ছিল না। কিন্তু তামাক চুক্তির শর্ত প্রকাশ্যে আসতেই জনরোষ চরমে ওঠে, বিশেষ করে যখন জানা যায়, অনুরূপ চুক্তিতে অটোমানরা অনেক ভালো শর্ত আদায় করেছিল।
উদীয়মান জাতীয়তাবাদ এই চুক্তিকে ক্ষোভের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করে। এই আন্দোলনে ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে পশ্চিম থেকে আগত গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ধারণার মিশ্রণ ঘটেছিল। এর কেন্দ্রে ছিল এক গভীর লজ্জাবোধ—যে জাতি নিজেকে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র বলে ভাবত, তারা শুধু পিছিয়েই পড়েনি, বরং এখন বিদেশিদের করতলগত।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত এক ইরানি ভিন্নমতাবলম্বী পত্রিকা ১৮৯০ সালে এই অভিযোগগুলো তুলে ধরে। সেখানে বলা হয়, দেশের সেনাবাহিনী বিশ্ববাসীর হাসির পাত্র, রাজপুত্ররা ভিক্ষুকের দয়ার যোগ্য, শহরগুলো ময়লার ভাগাড়, রাস্তা পশুপথের চেয়েও খারাপ, আর ধর্মীয় পণ্ডিতরা অবিশ্বাসীদের কাছে ন্যায়বিচার চাইছে।

শিয়া আলেমরা এই ক্ষোভকে সংগঠিত প্রতিরোধে রূপ দেন। সে সময়ের সর্বোচ্চ আয়াতোল্লা মির্জা শিরাজি তামাক ব্যবহার নিষিদ্ধ করে ফতোয়া জারি করেন, যতক্ষণ না শাহ চুক্তি বাতিল করেন। কয়েক দিনের মধ্যেই তামাকপ্রিয় ইরানে ধূমপান বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি শাহের হারেমের নারীরাও হুক্কায় টান দেননি।
শেষ পর্যন্ত ১৮৯২ সালে চুক্তি বাতিল হয়। এই ঘটনার স্মৃতি নিয়ে বড় হওয়া আমার প্রপিতামহী সারা জীবন দেশীয় সিগারেটেই অনুগত ছিলেন।
তাঁর বাবা মীর আবদোলরাজ্জাক ছিলেন একজন মুদ্রণালয়ের মালিক ও প্রবল জাতীয়তাবাদী। ১৯০৫ সালের বিপ্লবের পর সংসদ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি প্রবেশপথে স্থাপিত প্রতীকের নকশা করেন—‘আদল মোজাফফর’, অর্থাৎ বিজয়ী ন্যায়বিচার।
কিন্তু সাংবিধানিক জাতীয়তাবাদীদের অন্তর্দ্বন্দ্ব এতটাই তীব্র ছিল যে মীর আবদোলরাজ্জাক প্রতিদ্বন্দ্বী এক গোষ্ঠীর হাতে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড ১৯০৫-পরবর্তী বিশৃঙ্খলারই প্রতিফলন, যার পেছনে ব্রিটেন ও বিশেষ করে রাশিয়ার বিরোধিতাও বড় ভূমিকা রেখেছিল।
এই বিশুদ্ধতার প্রশ্ন আবার ফিরে আসে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে। নতুন শাসনব্যবস্থা অতীতের বহু চিহ্ন মুছে ফেলতে উদ্যত হয়—সংস্কৃতি, শিল্প, সঙ্গীত, সামাজিক জীবন—সবই বিশুদ্ধতার নামে বাতিল করা হয়।
এই বিপ্লব ধর্মীয় ঐতিহ্যের কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে ছিল এক আধুনিক প্রকল্প, যা এমন এক নিখুঁত অতীত নির্মাণ করতে চেয়েছিল, যা আদতে কখনো ছিল না।
আজ প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতের ইরানি নেতৃত্ব কি এই বিশুদ্ধতার মোহ কাটিয়ে বাস্তববাদী রাজনীতির পথে হাঁটতে পারবে? নাকি অতীতের মতোই চরমতার মূল্য দিয়ে দেশকে আবারও পিছিয়ে দেবে?
এ মুহূর্তে ইরানের তরুণ ভিন্নমতাবলম্বীরা আয়াতোল্লা আলি খামেনির ছবিতে আগুন ধরিয়ে সিগারেট জ্বালাচ্ছে। সেগুলো নিঃসন্দেহে পশ্চিমা ব্র্যান্ড।
সোহরাব আহমারি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী আনহার্ড-এর সম্পাদক।
সোহরাব আহমারি 



















