ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ থামাতে আবুধাবিতে শুরু হওয়া সর্বশেষ শান্তি আলোচনায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূখণ্ড প্রশ্ন। শুক্রবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় কোনো সমঝোতার ইঙ্গিত মেলেনি। এর মধ্যেই রাশিয়ার ধারাবাহিক বিমান হামলায় ইউক্রেন ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে পড়েছে, যা চলমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে।
ভূখণ্ড প্রশ্নে সমঝোতা নেই
প্রায় চার বছর ধরে চলা যুদ্ধের কেন্দ্রে থাকা ভূখণ্ড ইস্যুই এবারের আলোচনার মূল বিষয়। ইউক্রেনীয় ও রুশ কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, ভূমি প্রশ্নে মতবিরোধই শান্তি আলোচনার প্রধান বাধা। রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের শিল্পসমৃদ্ধ দোনবাস অঞ্চল পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার দাবি তুলেছে। অন্যদিকে কিয়েভ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, দোনেৎস্কসহ কোনো অঞ্চল ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

জেলেনস্কির অবস্থান ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়া যে যুদ্ধ শুরু করেছে, আগে তাদেরই তা শেষ করার সদিচ্ছা দেখাতে হবে। তিনি বলেন, আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করা সময়ের আগে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদের নিয়ে এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শনিবার পর্যন্ত চলবে বলে জানা গেছে।
এর একদিন আগে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ফাঁকে জেলেনস্কির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক হয়। জেলেনস্কি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা সংক্রান্ত একটি চুক্তি প্রস্তুত রয়েছে এবং শুধু স্বাক্ষরের তারিখ ও স্থান চূড়ান্ত হওয়া বাকি। ভবিষ্যতে রাশিয়ার সম্ভাব্য নতুন আগ্রাসন ঠেকাতে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে শক্ত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চায় ইউক্রেন।
বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা ও মানবিক শঙ্কা
শান্তি আলোচনার মধ্যেই রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বাড়িয়েছে। কিয়েভসহ বড় শহরগুলোতে বিদ্যুৎ ও গরমের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, যখন তাপমাত্রা শূন্যের অনেক নিচে নেমে গেছে। ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের প্রধান সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি মানবিক বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে। তার মতে, অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ছাড়া এই সংকট সামাল দেওয়া কঠিন।
ইউক্রেনের জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দিনটি ছিল দুই হাজার বাইশ সালের নভেম্বরের পর বিদ্যুৎ গ্রিডের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়। তখন থেকেই রাশিয়া পরিকল্পিতভাবে জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।
রাশিয়ার কঠোর শর্ত ও ইউক্রেনের আপত্তি
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দাবি, দোনেৎস্ক অঞ্চলের যে অংশ এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেটিও মস্কোর হাতে তুলে দিতে হবে। এই শর্তই শান্তি চুক্তির পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। জেলেনস্কি স্পষ্ট জানিয়েছেন, চার বছরের যুদ্ধে যে ভূখণ্ড রাশিয়া দখল করতে পারেনি, তা আলোচনার টেবিলে ছেড়ে দেওয়া হবে না। জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছে, ইউক্রেনীয় জনগণের বড় অংশ ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার বিপক্ষে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, দোনবাস পুরোপুরি হস্তান্তর করা রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। মস্কোর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, আগের একটি প্রস্তাব অনুযায়ী ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে বর্তমান যুদ্ধরেখা স্থির রেখে দোনবাসের নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার হাতে দেওয়ার চিন্তাও আলোচনায় রয়েছে।
জব্দ সম্পদ নিয়ে নতুন বিতর্ক
এদিকে রাশিয়া প্রস্তাব দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা রুশ সম্পদের একটি বড় অংশ ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলে পুনর্গঠনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। ইউক্রেন ও তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ রাশিয়াকেই দিতে হবে। জেলেনস্কি এই ধারণাকে সম্পূর্ণ অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন।
প্রথম ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হিসেবে গুরুত্ব
আবুধাবির এই আলোচনা যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো এমন একটি বৈঠক, যেখানে ইউক্রেন ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারীরাও অংশ নিচ্ছেন। গত বছর ইস্তাম্বুলে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মুখোমুখি বৈঠক হয়েছিল, তবে বড় অগ্রগতি আসেনি। এবারের আলোচনাও তাই নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















